হেঁটে হেঁটে ১১ হাজার মাইল


সীমান্ত তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। পিঠে চটের ব্যাগ, কাঁধে ক্যামেরা, চোখে-মুখে অসীম সাহস নিয়ে আজ থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে বাড়ি ছাড়েন টগবগে এক যুবক। প্রথমেই যান পশ্চিম পাকিস্তান হয়ে ইরান। তারপর টানা সাত বছর ১১ হাজার মাইল পথ হেঁটে ঘুরেছেন ২২টি দেশ। ভূপর্যটক ওসমান গণির সেই দুঃসাহসিক ভ্রমণের গল্প জানাচ্ছেন পরিমল মজুমদার। ১৯৬২ সাল। ওসমান গণি তখন চিলমারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাস এইটের ছাত্র। সাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণকারী দুই পাকিস্তানি পর্যটকের সঙ্গে তাঁর দেখা। তাঁদের কাছে ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কাহিনী শুনে শিহরিত হলো তাঁর কিশোর মন, সংকল্প করলেন তাঁদের মতোই একদিন বেরিয়ে পড়বেন। ইচ্ছার কথা তাঁদের জানাতেই কপালে জুটল তাচ্ছিল্য_'বাঙালিরা দুর্বল ও ভীতু জাতি। তারা কখনোই পারবে না।' এ কথা শুনে ক্ষুব্ধ কিশোর গণি প্রতিজ্ঞা করলেন হেঁটে হেঁটেই ঘুরে দেখবেন বিশ্ব। সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য জানতে হবে ইংরেজি। ভাষা শেখার জন্য একরোখা ছেলেটি চলে এলেন ঢাকা। ভর্তি হলেন পুরান ঢাকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম মিশনারি স্কুলে। সেখানে ইংরেজি শিখে বেরিয়ে পড়ার জন্য মনে মনে দিনক্ষণ ঠিক করলেন তিনি।  ২৭ এপ্রিল, ১৯৬৪। টেকনাফ থেকে যাত্রা শুরু করলেন ওসমান গণি। সম্বল বলতে কুড়ি টাকা, একটি হ্যাভারস্যাক, তাতে একটি লুঙ্গি, প্যান্ট-শার্ট। তেঁতুলিয়া পর্যন্ত হেঁটে বেড়ানোর পর চলে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তান। সেখান থেকে একে একে ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, মিসর, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ ভিয়েতনাম, হংকং, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, আফগানিস্তান ও ভারতসহ ২২টি দেশ হেঁটে সফর করেন তিনি। টানা সাত বছর হেঁটে ১১ হাজার মাইল পথ পরিভ্রমণ করেন।এ পরিভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতা জমা হয়েছে তাঁর সম্বলে। ১৯৬৫ সালের শেষ দিকে ইরাক থেকে ইরান যাওয়ার পথে মরু ডাকাতরা কেড়ে নেয় সর্বস্ব। ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চল ফুলু দ্বীপ থেকে চোরাচালানিদের মোটর বোটে কয়েক শ কিলোমিটার সমুদ্রপথ অতিক্রমের সময় ঝড়ের কবলে পড়ে বোটটি তছনছ হয়ে যায়। স্বাধীনতাকামী মোরো জঙ্গিরা তাঁকে ধরে নিয়ে যায় ইন্দোনেশিয়ার উপকূলীয় দ্বীপ মেনভোতে। সেখান থেকে পালিয়ে আবারও পথচলা শুরু।মালয়েশিয়ার একটি শহরে পেঁৗছানোর পর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। সেখানে বাসে চড়ে গন্তব্যে যাওয়ার সময় বাসে থাকা কয়েকজন ছাত্র তাঁকে চিনতে পারেন। তাঁরা প্রশ্ন করেন, তুমি কি ওসমান গণি? উত্তরে হ্যাঁ বলেন তিনি। ওই ছাত্ররা তাঁকে বলেন, তোমার তো হেঁটে চলার কথা, তুমি বাসে চড়েছ কেন? এ কথা বলেই তাঁরা ড্রাইভারকে বাস থামাতে বলেন এবং গণিকে বাস থেকে নামিয়ে দেন।  ১৯৬৫ সালে ইরান সফরের সময় এক সীমান্ত শহরের সরাইখানায় তাঁর সব টাকা-পয়সা চুরি হয়ে যায়। এই দুর্দশার খবর পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরে পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে গণিকে তিন হাজার ডলারের একটি চেক প্রদান করা হয়। তিনি এটি ভাঙিয়ে সব টাকা তেহরানের তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রদূত এস এম হোসেনের কাছে জমা রাখেন এবং তুরস্ক সফরে চলে যান। ১৯৮৬ সালে তিন হাজার ডলার ফেরত চেয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককে গণি চিঠি দিলে তিনি তাঁকে তাঁর দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনায় জিয়াউল হকের মৃত্যু হলে টাকা প্রাপ্তির বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। বারবার যোগাযোগের পর গণি অবশ্য ওই টাকার সমুদয় না পেলেও নওয়াজ শরিফ গণির নামে ৮০ হাজার রুপির একটি চেক প্রদান করেন। অবশিষ্ট টাকার জন্য বহুবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেও সুফল পাননি। এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি ভ্রমণ কাহিনী রচনা করেছেন তিনি। ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে পাণ্ডুলিপি দেখান। এটি বই আকারে প্রকাশের জন্য অনুরোধ জানালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বইটি প্রকাশের জন্য ষাট হাজার টাকা বরাদ্দ করেন এবং একজন মন্ত্রীকে বইটি প্রকাশের দায়িত্ব অর্পণ করেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে বেশ কয়েকবার ওই মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। বই আর ছাপা হয়নি। ওসমান গণির বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায়। কড়ালগ্রাসী ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে সহায়-সম্পত্তি ও বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েই দীর্ঘদিন থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে আশ্রিত জীবন যাপন করছেন উলিপুর উপজেলার তবকপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে। (সূত্র: কালের কন্ঠ)
News Pabna

নবীনতর পূর্বতন