অরূপ রাহী ●
২০১০-এর এপ্রিলে একবার পাঁয়তারা হয়েছিল বলিউডি সিনেমা আমদানির। বাণিজ্যমন্ত্রীর অতি উৎসাহ সত্ত্বেও চলচ্চিত্রকর্মীদের আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করায় সে যাত্রা ভারতীয় সিনেমা আমদানি স্থগিত করা হয়েছিল। এ বছর আবার সেই তোড়জোড়। ময়দানে হাজির বাংলা সিনেমার উন্নতিকল্পে বলিউডি সিনেমা আমদানিকরণেওয়ালারা। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি চাঙ্গা করতেই নাকি এই আমদানির অনুমতি। হল মালিক সমিতির সভাপতি বলেছেন, দেশের সিনেমার জন্য নাকি এর চেয়ে ভালো ঘটনা আর হতে পারে না। হল মালিকদের দিক থেকে সাময়িক খুশি হওয়ার কারণ থাকতে পারে, কিন্তু দেশের সিনেমা ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু বলিউড-হলিউড দিয়েই কি তারা মুনাফার মুখ চিরকাল দেখতে পাবেন ভেবেছেন? আরো একটু ভাবার অবকাশ আছে। সিনেমা হল উঠে যাওয়ার সঙ্গে ‘ভালো ছবি’ না হওয়া যেমন যুক্ত, তেমনি, সিনেমা শিল্প এবং হল টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের ভূমিকার খোঁজ-খবরও নেওয়া দরকার, বিশেষত যে দেশের ছবি তারা আমদানি করছেন সবার আগে, সেই ভারতের। বলিউড সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে দেখিয়ে কি করে বাংলাদেশের সিনেমার উন্নতি ঘটাবেন? তাদের যুক্তি, ভারতীয় সিনেমা ঢুকলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশের সিনেমাও ‘ভালো’ হয়ে উঠবে। এ যুক্তিতে হল মালিকরা খুশিতে বগল বাজাতে শুরু করেছেন এবং আমদানিকারকরা বলছেন, এটা নাকি বাংলাদেশের সিনেমার জন্যে সবচেয়ে ভালো ঘটনা। এই খুশি হওয়ার তালিকায় জনপ্রিয় লেখক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হূমায়ুন আহমেদ, কলামিস্ট মশিউল আলমও আছেন। অন্যদিকে প্রায় নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী-কলা-কুশলীরা, চলচ্চিত্র আন্দোলনের কর্মীরা, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীরা এই আমদানির বিরোধিতা করছেন। আশা করি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সেসবের খবর পৌঁছাচ্ছে। জাতীয় সম্পদের মতো, জাতীয় সংস্কৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও কিভাবে তিনি তার দেশপ্রেমের পরিচয় দেন, জনগণ তা লক্ষ্য করবে।
২.সিনেমা আমদানির পণ্য তো বটেই। পুঁজিবাদের কালে, পণ্যসংস্কৃতির কালে যে কোনো ‘আর্ট’ই পণ্য হয়ে উঠতে পারে। আলু, পেঁয়াজ, ডাল, শাড়ি, লেহেঙ্গা, টুথপেস্টের মতো বই, সিনেমা, চিত্রকর্মও বাজার সম্পর্কের মধ্যে পণ্য হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজনে একটা দেশ আরেক দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতেই পারে। এমনকি সাংস্কৃতিক পণ্যও। কিন্তু দেখার বিষয় আছে যে, কোন পণ্য আমদানিতে দেশের কোন পণ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাংস্কৃতিক মান, ভালো-মন্দ, উচ্চতা-নিচতার বিচার বাদ দিলেও, শুধু নিছক আর পাঁচটা ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিচার করলেও, ভারতীয় সিনেমা, বলিউডি সিনেমা আমদানি করলে বাংলাদেশের সিনেমা লাভবান হবে, শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি হবে, এই তত্ত্ব যারা দেন, তাদের সাংস্কৃতিক বিবেচনা তো দূরের কথা, অর্থনীতির কান্ডজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার। ভারতীয় সিনেমা, তা সে টালিউড হোক আর বলিউড হোক, তামিল হোক, গত অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে যেই পরিমাণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে চলেছে, বাংলাদেশে, এ দেশের অর্থনীতির অনুপাতে তার অতিসামান্য অংশও এ দেশের সিনেমা পায়নি। ভারত সে দেশের সিনেমার বিকাশের জন্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সিনেমা বিষয়ক বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করে তা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে, বেসরকারি খাতে সিনেমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশ এখনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একটা পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ পর্যন্ত নেয়নি। যেটা কিনা এ দেশের চলচ্চিত্রকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি। উল্টো এখানে চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ন্ত্রণ আইনের মতো কালো আইন পাস করা হয়, অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন রাখা হয় এবং সরকার পরিবর্তন হলেও এসব আইন বাতিল হয় না।
এখনও পর্যন্ত ভারতীয় সিনেমা শিল্প আরো নানান কায়দায় রাষ্ট্রীয় নীতি সুবিধা পায়। যেমন অনেক ক্ষেত্রে প্রেক্ষাগৃহগুলো কর মওকুফ পায়। নেহেরুর সংরক্ষণনীতির সুবিধাপ্রাপ্ত হয়ে বিকশিত বিশাল ভারতীয় পুঁজির বিনিয়োগে ফুলে-ফেঁপে ওঠা বলিউড সিনেমার সঙ্গে ঢাকার সিনেমাকে একই পুকুরে সাঁতারের পাল্লা দিতে বলা মানে ঢাকাই সিনেমাকে হাত-পা বেঁধে সাঁতরাতে বলা।
কেউ কেউ বলছেন, ভারতীয় সিনেমার আমদানি অবাধ করে দিলে দু’দেশের যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ বাড়বে, এতে বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির লাভ হবে। এ কথা বলা হয় ‘বিদেশী বিনিয়োগ’ মানেই উন্নতি- এই ভ্রান্ত, অপরিণামদর্শী চিন্তা থেকে। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি-অর্থনীতির কর্মী-উদ্যোক্তা মহলের একটা বড় অংশ নয়াউদারনৈতিক নীতি-আদর্শে এতটাই মোহাচ্ছন্ন যে এর পূর্বাপর বিবেচনার কোনো অবস্থা তাদের নেই। সারা দুনিয়ার ‘গরিবদেশ’গুলোতে বিদেশী বিনিয়োগের নামে কতভাবে লুটপাট, দখল, লুন্ঠন হচ্ছে তা খতিয়ে দেখার ইচ্ছা তাদের নেই, কারণ তারা নগদে দু’পয়সা কমিশন বা লুটের ভাগ পাচ্ছেন। বিনিময়ে দেশের সম্পদ-সংস্কৃতি-সার্বভৌমত্ব তুলে দিচ্ছেন আগ্রাসী বহুজাতিক বা আঞ্চলিক করপোরেট শক্তিগুলোর কাছে।
৩.
অনেকের ধারণা হতে পারে, বলিউডের মনে হয় কোন সংকট নেই। আদতে কি তাই? তথ্য-পরিসংখ্যান তা বলে না। বছরে হাজার খানেক ছবি তৈরি হয় ভারতে। তার মাত্র শতকরা দশভাগ ছবি ব্যবসা সফল হয়। অন্যদিকে বলিউডের ‘সুপারস্টার’দের পারিশ্রমিক এত বেড়ে গেছে যে প্রযোজকরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। অনেকে বিকল্প উপায় খুঁজছেন। উইকিলিকসে প্রকাশিত এক তারবার্তায় বলিউডের এই সংকটের কথা জানিয়েছে মুম্বাইয়ের মার্কিন কনস্যুলেট। সেখানে বলা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের পর লাভের অংক তেমন জমে না ওঠায় বলিউড তার বাজার বাড়ানোর কথা ভাবছে। ভাবা হচ্ছে হলিউড-বলিউড যৌথ প্রযোজনার কথা। তাতে অবশ্য অনেক বলিউডি প্রযোজক শংকিত। এগুলো পুঁজিবাদী উৎপাদনের সাধারণ সংকট। বাজার সম্প্রসারণ, ধরে রাখা ও টিকে থাকার সংকট। সে আরেক লম্বা আলোচনা- আরেক সময় করা যাবে।
বাংলাদেশে বলিউডের যে বিশাল ‘বাজার সম্ভাবনা’ তা ভারতপুঁজি দখলের চেষ্টা করবে না, তা কী করে সম্ভব? একই কারণে হলিউডের হলিউড-বলিউড প্রযোজনার কথা উঠে আসছে। কিন্তু সেখানেও বলিউডের অনেকের আপত্তি ও আশঙ্কা আছে। অর্থাৎ, নিছক অর্থনৈতিক লাভালাভের জায়গা থেকেই বলিউড কোনো শঙ্কাহীন অবস্থায় নেই। ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বলিউড অর্থনীতির একটা বড় অংশ বিনিয়োগ করে ‘কালোটাকা’র মালিকরা, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড গডফাদার’রা। এর সঙ্গে যুক্ত নানা ধরনের করপোরেট ক্রাইম তথা ‘স্মার্ট বিজনেস’ এবং রাজনৈতিক ধান্দা। তবে, বলিউডের সবচেয়ে বড় রাজনীতি হলো ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’ প্রোপাগান্ডা। মার্কিন-ইসরাইল-ভারত অক্ষশক্তি গঠন, ভারতের পরাশক্তি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামরিক প্রভাব নিরঙ্কুশ করতে ভারতের দরকার সাংস্কৃতিকভাবে এ অঞ্চলকে প্রভাব বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসা। সেটা কি? সেটা হলো বলিউড, যা কিনা ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’ করপোরেট শক্তির সাংস্কৃতিক পরিচয়, তার প্রভাবে নিয়ে আসা। এমনিতেই আমাদের দেশের ‘জনগণ’, ‘সংস্কৃতি’ অঙ্গন এবং গণমাধ্যমের একট বড় অংশ বলিউড সংস্কৃতির আদর্শিক আধিপত্যের মধ্যে আছে। এই প্রভাব বলয় আরো বাড়ানো এবং তাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সরাসরি বলিউড সিনেমা এবং তার ‘তারকা’দের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি দরকার। সে ব্যবস্থাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আমাদের বিদ্যুৎ সমস্যা, নদী-পানি সমস্যা, সীমান্ত সমস্যা- সব কিছুর মূলে করপোরেট ভারত। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে, নদীর পানি বাঁধ দিয়ে আটকিয়ে, পণ্যের বাজার দখল করে, সীমান্তে প্রায় প্রতিদিন হত্যাকান্ড ঘটিয়ে ভারত যে ‘বন্ধুত্বে’র প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে, বলিউড সিনেমা আমদানি সেই ‘বন্ধুত্ব’র সীমা বাড়িয়ে তুলবে, সন্দেহ নেই। এই ‘বন্ধুত্বে’র আরেক নাম আগ্রাসন। আধিপত্যবাদ। কিন্তু কোনো আধিপত্যবাদই স্থানীয় দালাল/সহযোগী ছাড়া কাজ করতে পারে না। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বলিউড আধিপত্যের এই আয়োজনের দায় বলিউড সিনেমা আমদানিকারক-পরিবেশক-প্রদর্শকরা কিভাবে এড়াবেন?
৪.
অনেকের এটাও ধারণা, বলিউডের সিনেমাই ভারতের সিনেমার শেষ কথা। এরকম ভ্রান্ত ধারণার পেছনেও কাজ করে করপোরেট ভারতের করপোরেট মিডিয়ার আধিপত্য। সত্যজিত, ঋত্বিক, মৃনাল সেন, দাদা সাহেব ফালকে, আদুর গোপাল কৃষ্ণান, গিরিশ কারনাডসহ অসংখ্য নির্মাতা-কলাকুশলী আছেন, যারা ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’র করপোরেট ভাবাদর্শের বাইরে থেকে ভারতের জনগণের জীবন-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী সিনেমা বানিয়েছেন, বানাচ্ছেন। তাদের খবর পাওয়া যায় কম। পণ্য সংস্কৃতির দাপটে বলিউড বাংলাদেশে গণমাধ্যমের বিশাল অংশ দখল করে থাকে। তো সেসব ভারতীয় সিনেমা, যা ভারতের জনগণের জীবন-সংস্কৃতির কথা বলে, তা কি আমরা দেখব না? উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ। শুধু ভারত নয়, সারা দুনিয়ার যে কোনো প্রান্তের জীবন-সংস্কৃতির ছবি আমরা দেখব। কিন্তু তার জন্য অবশ্যই একটা নীতিমালা, একটা নির্বাচন পদ্ধতি, একটা মানদন্ড থাকতে হবে।
আমাদের দাবি হলো : এই নীতিমালা, নির্বাচন পদ্ধতি, মানদন্ড নির্ধারণের জন্য সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ চলচ্চিত্র সংসদগুলোর সঙ্গে বসুক। দেশের সিনেমার প্রযোজক, পরিচালক, কলাকুশলীদের সঙ্গে বসুক। শিল্পী-সাহিত্যিক-সমালোচক-সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে বসুক। সবাই মিলে গ্রহণযোগ্য একটা নীতিমালা প্রণয়ন করুক, যার ভিত্তিতে আমরা সারা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সিনেমাগুলো প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখতে পারি। আমরা যখন বলিউড এবং ভারতের কথা বলি, তখন আমরা ভারত রাষ্ট্রে এবং তার করপোরেট শক্তির কথা বলি। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র এবং জনগণ এক নয়। করপোরেট, ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’ রাষ্ট্র ভারতের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। করলে প্রতিবছর সে দেশে হাজার হাজার কৃষক উৎপাদিত ফসলের দাম না পেয়ে আত্মহত্যা করত না। দুনিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি অংশ ভারতে বাস করতো না। প্রতিনিয়ত সেই জনগণের লড়াই সংগ্রামের ওপর ভারত রাষ্ট্রের নিপীড়ন চলছে। ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’ সেই নিপীড়িত, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শ্রম, সম্পদ ও সংস্কৃতির ননী-মাখন খাওয়া লুটপাটকারী করপোরেট শক্তি। তার লুটপাট, নির্বিকার ভোগবাদি, সেক্সিস্ট, পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বার্থক প্রতিনিধিত্বকারী হচ্ছে বলিউড সিনেমা। তাকে কোনোভাবেই সাদরসম্ভাষণ জানানোর সুযোগ নেই।
৫.
উৎপাদনী আয়োজনের দিক থেকে সিনেমা অন্য যে কোনো শিল্প মাধ্যম থেকে আলাদা। বিশেষত বাণিজ্যিক সিনেমা। এর সঙ্গে পুঁজি বিনিয়োগের প্রশ্ন জড়িত। মুনাফার প্রশ্ন জড়িত। ফলে মুনাফার জন্য ‘পাবলিক খায়-পাবলিক চায়’ অজুহাতে ‘মসলা’ সিনেমা বানানোই সিনেমা ব্যবসার প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। এর বাইরে কোনো সিনেমা নির্মিত হতে হলে দরকার হয় এমন প্রযোজক/উদ্যোক্তা ও নীতিপরিবেশ, যা ‘মসলা’ ফর্মুলার বাইরে, জনগণের জীবন-সংস্কৃতির, জনসংস্কৃতির সিনেমা নির্মাণ সম্ভব করে তোলে। এই নীতিপরিবেশ সে রকম রাষ্ট্রে সম্ভব, যে রাষ্ট্র ন্যূনতমমাত্রায় হলেও গণতান্ত্রিক। যেখানে জনসংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী ছবি নির্মাণে রাষ্ট্রের নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থানুকুল্য আছে। সাম্রাজ্যবাদের যুগে, করপোরেট বিশ্বায়নের যুগে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিভাবে অর্জন করা সম্ভব, লড়াইয়ের ধরন-কৌশল কি হবে- তা লম্বা তর্ক-আলোচনার বিষয়। কিন্তু এটুক তো আমরা একমত হতে পারি, বহুজাতিক করপোরেট পুঁজির উদ্দেশ্য আমাদের উন্নতি নয়। তাই নিজস্ব অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সক্ষমতার, নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আসছে। এটা ঠিক অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও আবদুল জববার খানের পথ ধরে জহির রায়হান, আলমগীর কবির, খান আতাউর রহমান, সুভাষ দত্তসহ অনেকে মধ্যবিত্ত/‘রুচিবান’ দর্শকদের জন্যে ‘ভালো’ ছবি বানিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী আশি ও নববই দশকে কেন ‘ভালো ছবি’ নির্মাণ বন্ধ হয়ে গেল, কেন শুধু গরিব রিকশাওয়ালা-গার্মেন্টস শ্রমিক-বস্তিবাসীদের ‘টার্গেট’ করে ঢাকাই ‘মসলা’ সিনেমা তৈরি হতে শুরু করল, কেন মধ্যবিত্ত দর্শক হলবিমুখ হলো- তার কারণ এবং এর জন্য কার দায়, তাও খতিয়ে দেখার দরকার আছে।
ঢাকাই সিনেমাকে ‘ছিঃনেমা’ বলে তার সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না, দায়িত্ব শেষ হয় না। রাষ্ট্র যদি গণতান্ত্রিক না হয়, সিনেমার মূলধারাও গণতান্ত্রিক হয় না। জনগণের সমগ্র অংশের চিন্তা-জীবন-সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে না। যদিও শিল্পের প্রধান ভূমিকা রাষ্ট্রের আনুকূল্যনির্ভর নয়। কিন্তু জাতীয় সিনেমা, গণসিনেমা, জনসংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী সিনেমা- যে নামেই ডাকি, তার ব্যাপক চর্চা/উৎপাদনের জন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতার প্রয়োজন। চলচ্চিত্রকর্মী, দর্শক, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীরা রাষ্ট্রের সেই ভূমিকা পালনের আহবান জানিয়ে আসছেন। এবার সেই শক্তিগুলোকে আরো বড় লড়াইয়ের জন্যে তৈরি হতে হবে। কারণ জাতীয় সিনেমার বিকাশের সঙ্গে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্ন সরাসরি যুক্ত। জাতীয় সিনেমা বিকাশের উপযোগী একটা গণতান্ত্রিক চলচ্চিত্র নীতিমালা প্রণয়নের আন্দোলন সেই কাজকে এগিয়ে নিতে পারে।
