২৫ মার্চ, ২০১৩

প্রযুক্তি গুরু স্টিব জবস বৃত্তান্ত

পুরো নাম স্টিভেন পল জবস। সংক্ষেপে স্টিভ জবস। তিনি  যুক্তরাষ্ট্রের একজন সফল উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবক। এক কথায় সেরা আধুনিক প্রযুক্তিবিদ। তাকে পিসি অর্থাৎ পার্সোনাল কম্পিউটার বিপ্লবের পথ প্রদর্শক হিসেবেও আখ্যায়িত করা যায়। ১৯৭৬ সালে তিনি স্টিভ ওজনিয়াক এবং রোনাল্ড ওয়েন-এর সাথে অ্যাপল কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অ্যাপল ইনকর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম এবং সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।

স্টিভের জন্মবৃত্তান্ত ও পরিবার

জবস ১৯৫৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিস্কোতে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে পল ও ক্লারা জবস নামক এক দম্পতি তাকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সেই দম্পতির নেম টাইটলে অনুযায়ী তার নামকরণ করা হয় স্টিভেন পল জবস।
কিন্তু তার আসল  মা খ্রিস্টান, জোয়ান ক্যারোল এবং বাবা ছিলেন মুসলমান, আব্দুল্লাহ ফাতাহ জান্দালি। তিনি  রাস্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। যারা জবস-এর বোন হলেন বিখ্যাত নারী সাহিত্যিক মোনা সিম্পসন।
স্টিভ জবস ১৯৯১ সালে লরেন পাওয়েল-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহিত জীবনে চার সন্তানের জনক স্টভ জবসের দাম্পত্য জীবন খুব সাদামাটাভাবেই কেটেছে।

স্টিভের স্কুল জীবন

স্টিভ জবস ১৯৭২ সালে হাই স্কুলের পাঠ শেষ করেন এবং রীড কলেজ়ে ভর্তি হন। তবে তিনি পরবর্তীতে কলেজ ছেড়ে দেয়ার পরেও ক্যালিগ্রাফীসহ আরো কিছু ক্লাসে যোগদান করেছিলেন।  তিনি প্রায়ই কুপারটিনো জুনিয়র হাই স্কুলে এবং হোমস্টিড হাই স্কুলে গিয়ে হিউলেট-প্যাকার্ড কোম্পানির লেকচারগুলোতে অংশগ্রহণ করতেন। যেখানে পরবর্তীতে তিনি গ্রীষ্মকালীন কর্মচারী হিসাবে স্টিভ ওজনিইয়াকের সাথে কাজ শুরু করেন। এই সম্পর্কে তার বক্তব্য ছিল, যদি আমি ওই কোর্সে না যেতাম তবে ম্যাকের কখনোই বিভিন্ন টাইপফেস বা সামঞ্জস্যপূর্ণ ফন্টগুলো থাকতো না।”

কর্ম জীবনের শুরুতে

১৯৭৪ সালে জবস ক্যালির্ফোনিয়াতে চলে এসে  ওজনিয়াকের সাথে নিয়মিতভাবে হোমব্রিউ কম্পিউটার ক্লাবের সভাগুলোতে উপস্থিত থাকতেন। পরবর্তীতে তিনি ভিডিও গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আটারিতে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেন।

ধর্মান্তরিত স্টিভ

মূলত তিনি ভারতে যাবার জন্য অর্থ জমানোর চেষ্টা করছিলেন। অতঃপর স্টিভ জবস ভারতে নিম কারোলি বাবার কাইনিচি আশ্রমে তার বন্ধু ড্যানিয়েল কটকের সাথে ভ্রমন করেন এবং পরবর্তী সময় তিনি আধ্যত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য আবার ভারতে এসে বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হন।

পেশাদারী কর্মজীবনে স্টিভ

অ্যাপল প্রতিষ্ঠা-
১৯৭৬ সালের ১লা এপ্রিল স্টিভ জবস, স্টিভ ওজনিয়াক এবং রোনাল্ড ওয়েন অ্যাপল কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন। একই বছরে তারা অ্যাপল ১ নামের প্রথম কম্পিউটারও অবমুক্ত করে।  উল্লেখ্য, অ্যাপল প্রতিষ্ঠার আগে ১৯৭১ সালে ইলেকট্রনিক্স হ্যাকার ২১ বছরের ওজনিয়াকের সাথে জবসের পরিচয় হয়। আর জবসের তখন বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর।
আশির দশকের শুরুতে জবসের আগ্রহেই অ্যাপল লিসা  নামের ৯,৯৯৫ ইউএস ডলার মূল্যের ডেক্সটপ কম্পিউটার বাজারজাত করা শুরু করা হয়। কিন্তু অত্যাধিক মূল্যের কারনে লিসা বাজারে তেমনভাবে সুবিধা করতে পারেনি।
১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাসে স্টিভ জবস নতুন ধরনের ডেক্সটপ ম্যাকিন্টশ নির্মানের ঘোষনা দেন। সেই সুবাদে ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে অ্যাপল ম্যাকিন্টশের বাজারজাতকরন শুরু হয়। ১৯৮৫ সালের মে মাসে জবসকে অ্যাপলের ম্যাকিন্টশ কম্পিউটারের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়।

নেক্সট কম্পিউটার-
১৯৮৫ সালের অক্টোবর মাসে স্টিভ জবস নিজে থেকেই অ্যাপল প্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ করেন এবং ৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার দিয়ে নেক্সট কম্পিউটার নামক নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নেক্সট কম্পিউটার থেকে জবস ১৯৯০ সালে নেক্সটষ্টেশন নামের পিসি বাজারজাত করন শুরু করেন। এই ওয়ার্কষ্টেশন গুলোর দাম ছিল ৯,৯৯৯ মার্কিন ডলার।
পিক্সার ও ডিজনী-
১৯৮৬ সালে জবস পিক্সার (সাবেক নাম দ্য গ্রাফিক্স গ্রুপ) লুকাস ফিল্ম এর কাছ থেকে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কিনে নেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই জবস ডিজনীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কম্পিউটার অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র বানাতে শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে মুক্ত পাওয়া টয় ষ্টোরি চলচ্চিত্রটি প্রথম চলচ্চিত্র যেখানে স্টিভ জবস এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যা কিনা পুরো বিশ্বে ব্যাপকভাবে সাড়া পড়ে যায় এ্যানিমাটাড চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে। পরবর্তীতে স্টিভ জবস পিক্সারের ক্রিয়েটিভ প্রধান জন লেস্যেটার এর সাথে একত্রিত হয়ে অনেকগুলো চলচ্চিত্র নির্মান করেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলো হল-
এ বাগস লাইফ (১৯৯৮),
টয় ষ্টোরি ২ (১৯৯৯),
ফাইন্ডিং নিমো (২০০৩),
টয় ষ্টোরি ৩ (২০১০) প্রভৃতি।
অ্যাপলে প্রত্যাগমন ও পুনরায় ত্যাগ-
১৯৯৬ সালে অ্যাপল ৪২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেক্সট কম্পিউটারকে কিনে নিলে জবস আবার অ্যাপল প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসেন। ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসের দিকে স্টিভ জবস অ্যাপলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে  ২০০০ সালে তিনি অ্যাপলের প্রধান সিইও হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। উল্লেখ্য, স্টিভ জবস এ সময়ে কম্পিউটার যন্ত্রপাতি নির্মাণ ছাড়াও ডিজিটাল বিনোদনের নানা উপকরন নির্মাণের দিকে বিশেষভাবে নিজেকে মনোনিবেশ করেন। তিনি ২০০৭ সালের ২৯ জুন  প্রথম আইফোন বাজারজাত করা শুরু করেন। নান্দনিক প্রযুক্তি ও আধুনিকতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিনোদনের জগতে স্টিভ জবস একে একে প্রবর্তন করেন আইপড, আইপ্যাড।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে জবস অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব থাকাকালিন পদত্যাগ করেন। কিন্তু তারপরেও তিনি কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে যান।

স্টিভের অর্থসম্পদ

স্টিভ জবস অ্যাপল কম্পিউটারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে বছরে মাত্র ১ মাকিন ডলার বেতন গ্রহন করতেন। কিন্তু তার কাছে ছিল অ্যাপলের ৫.৪২৬ মিলিয়ন শেয়ার এবং ডিজনীর ১৩৮ মিলিয়ন শেয়ার। ২০১০ সালের ফরবেসের হিসেবানুযায়ী তিনি ৮.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিকারী হয়ে ৪৩তম মার্কিন ধনী হিসেবে নির্বাচিত হন।

না ফেরার দেশে স্টিভ

স্টিভ জবস দীর্ঘদিন অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে ভুগে ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে এই আধুনিক প্রযুক্তিবিদের মহা প্রয়াণে বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের অপরিসীম ক্ষতি হয়েছে। যা কখনোই পূরণ হবার নয়।

অকৃত্রিম সম্মাননা

স্টিভ জবস ১৯৮৫ সালে স্টিভ ওজনিয়াকের সাথে যৌথভাবে প্রথম ন্যাশনাল মেডেল অব টেকনোলজি লাভ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন ২০১১ সালে ৩২ জনের নাম ‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’ হিসেবে মনোনীত করে। এ তালিকায় আঙ্গেলা ম্যার্কেল, বারাক ওবামা, সিলভিও ব্যার্লুস্কোনি, লিওনেল মেসির মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি তিনিও স্থান পেয়েছেন৷ সূত্র: www.newspabna.com