২৫ মার্চ, ২০১৩

২৬ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে ১২৩তম লালন স্মরণোৎসব

আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়/মানুষ ছেড়ে খেপারে তুই মুল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি অথবা যেখানে সাঁইর বারামখানা এ রকম অসংখ্য গানের স্রষ্টা কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া লালন বারাম খানায় বসেছে সাধুর হাট।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ও লালন একাডেমির আয়োজনে কালি নদীর পাড়ে ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৫ দিনব্যাপী চলবে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১২৩তম স্মরণোৎসব। এরই মধ্যে সারাদেশ থেকে বাউল ভক্ত অনুরাগীরা আসতে শুরু করেছেন আখড়াবাড়িতে।

২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের কারণে সন্ধ্যা ৭টার সময় লালন ভক্ত ও বাউলদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে এবং ২৭ মার্চ উদ্বোধনীর দ্বিতীয় দিনে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন কুষ্টিয়া-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য বেগম সুলতানা তরুন এমপি।


লালন একাডেমি ও বিশাল মাঠ জুড়ে বসবে বাউল সাধুদের মিলনমেলা। এছাড়াও থাকবে গ্রামীণ মেলা, নাগরদোলাসহ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান।

মেলার যাবতীয় প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছে লালন একাডেমি। মূল মাঠের দক্ষিণপাড়ের স্থায়ী মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। একাডেমির নিচে বাউলদের বসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

সরেজমিন লালন আখড়া বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, মাজার প্রাঙ্গণ ও একাডেমির নিচে হাজারো লালন ভক্ত, সাধু-বাউলের ভিড়ে মুখরিত। কোন এক উদাসী টানে দূর-দূরান্ত থেকে এরা ছুটে এসেছেন এ বাউল ধামে। একাডেমি ভবনের নিচতলার পুরো মেঝে জুড়ে আসন পেতে নিয়েছেন তারা।

ঢাকা থেকে আসা লালন ভক্ত আসলাম সাঁই জানান, বাউল সম্রাট লালন ফকিরের আঁখড়া বাড়িতে আসলে মনটাই কেমন উদাস হয়ে যায়। মন ডুবে যায় তার গানের মাঝে। এ গান ফেলে রেখে উঠে আসতে মন চাইবে না।

চুয়াডাঙ্গা থেকে কানাই পাগল শাহ্‌ কয়েকদিন আগেই এই লালন ধামে আসন পেতেছেন। তিনি বলেন, রহস্য পুরুষ লালনের ভেদ বোঝা খুবই মুশকিল। ফকির লালনকে নিয়ে বেশকিছু কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। লালনের গানই তাকে অমর করেছে।

বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত ও লালন গবেষক ড. আবুল আহসান চৌধুরী জানান, লালন ছিলেন গানের মানুষ। সে গান সমপ্রদায়ের দীক্ষিতজনের কাছে সাধনার রহস্য প্রকাশের জন্যেই মূলত রচিত হয়েছে। কিন্তু এ প্রয়োজন ছাপিয়ে তার গানের ভাব-ভাষা-ভাবনায় এমন মেধাবী বক্তব্য, আকর্ষণীয় অলংকার ও চেতনায় ঐশ্বর্য প্রচ্ছন্ন ছিল- তা সমপ্রদায় বহির্ভূত সুধীজনকে কেবল আকৃষ্ট ও মুগ্ধই করেনি, প্রাণিতও করেছে।

জেলা প্রশাসক লালন একাডেমির সভাপতি সৈয়দ বেলাল হোসেন জানান, এবার অনুষ্ঠান অনেক সুন্দর হবে। অনুষ্ঠানের মূল প্রাণই বাউলরা। তারা যাতে কষ্ট না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে। এবারের অনুষ্ঠানে লোক সমাগম হবে অনেক বেশি। বাউলদের যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচারে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন যখন বিষিয়ে তুলেছিল, ঠিক সেই সময়ে সত্যের পথ ধরে, মানুষকে দীক্ষা দিতেই মানবতার পথ প্রদর্শক হিসেবে লালনের আর্বিভাব ঘটে কুমারখালীর ছেউড়িয়াতে। লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানা মত থাকলেও নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে লালন ফকির ১৭৭৪ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। আর্থিক অসঙ্গতির কারণে তিনি প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ করতে পারেননি। তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত।

যৌবনকালে পুণ্য লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমণে বেরিয়ে তার যৌবনের রূপান্তর ও সাধন জীবনের প্রবেশ ঘটে। তীর্থযাত্রাকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। পরে একজন মুসলমান সাধুর দয়া ও আশ্রয়ে জীবন ফিরে পাওয়ার পর তিনি সাধক ফকির হন। প্রথমে তিনি কুমারখালীর ছেউড়িয়া গ্রামের গভীর বনের একটি আমগাছের নিচে সাধনায় মগ্ন হন। পরে স্থানীয় কারিকর সমপ্রদায়ের সাহায্য লাভ করেন। লালনভক্ত মলম শাহ আখড়া তৈরির জন্য ষোল বিঘা জমি দান করেন। দানকৃত ঐ জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালনের বসবাস ও সাধনার জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরি করা হয়। সেই ঘরেই তার সাধন-ভজন চলত। ছেউড়িয়ায় আখড়াঘর তৈরির পর লালনের মৃত্যু পর্যন্ত শিষ্য ভক্তদের নিয়ে পরিব্যাপ্ত থাকতো।

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সূত্র: www.newspabna.com