২৫ মার্চ, ২০১৩

আজ সেই ভয়াল কালরাত

২৫ মার্চের কালরাত আজ। ১৯৭১ সালের ভয়াল এ রাতে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যা সংঘটিত হয়। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগমুহূর্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ এ দেশের বড় শহরগুলোতে নির্মম হত্যাযজ্ঞ
চালিয়ে কমপক্ষে ৫০ হাজার ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করে। জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে সেই কালরাতে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষকে। রাজধানীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন 'কালরাত্রি' স্মরণে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দিনভর থাকছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাতে মোমবাতি প্রজ্বালন। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা লাখো তরুণের দুনিয়া কাঁপানো গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সামনে ২৫ মার্চ রাত ১১টা ৫৮ মিনিট থেকে ১২টা পর্যন্ত 'নিষ্প্রদীপ' কর্মসূচি পালন করা হবে। শিখা চিরন্তনে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম রাতে একই সময়ে একই কর্মসূচি পালন করবে।

গণহত্যার নীলনকশা 'অপারেশন সার্চলাইট' বাস্তবায়নে সেদিন মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানি সেনারা মেতে উঠেছিল বাঙালি নিধনযজ্ঞে। তবে পঁচিশ মার্চ শুরু হওয়া এ নিধনযজ্ঞ চলেছে পরের টানা ৯ মাস। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে গোটা বাংলাদেশই হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। নৃশংস ও বর্বরোচিত এ হত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তাদের এদেশীয় দোসর ঘাতক-দালাল রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর সদস্যরা।
পঁচিশ মার্চের এ নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার বিরুদ্ধে অসম সাহসী বাঙালির প্রতিরোধে গণহত্যার এক রাত পরই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ঘটে। পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতারের আগমূহূর্তে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে শুরু হয় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন-প্রতিরোধের অগি্নস্ফুলিঙ্গ। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসে সেনা ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা। জাতির অস্তিত্ব রক্ষার এ লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর ৩০ লাখ শহীদের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
একাত্তরের পঁচিশ মার্চের সকাল থেকেই অজানা আশঙ্কায় দিন কেটেছে বাঙালির। দিনভর অশান্ত পরিস্থিতি ছিল দেশজুড়ে। এমনি এক পরিস্থিতিতে এক সময় বেতারের প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারি কোনো ঘোষণাও প্রচারিত হয়নি সেদিন। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত অবধি মিছিল-মিটিং-স্লোগানে মুখরিত রাজধানী ঢাকাবাসীর প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়ে এক সময়। গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে অনেকে আবার প্রস্তুতিও নিচ্ছিল ঘুমুতে যাওয়ার।
কিন্তু নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষ কেউই ঘুণাক্ষরে জানতে পারেনি ততক্ষণে খুলে গেছে নরকের দরজা। রাত সাড়ে ১১টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে প্রথম রাস্তায় নেমে আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তারা প্রথমে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পরে একে একে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডি ও পিলখানার পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) সদর দফতরসহ রাজধানীর সর্বত্র আক্রমণ চালিয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পাশাপাশি নিধনযজ্ঞ চালায় চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি বড় শহরেও। তবে রাজারবাগ পুলিশ সদর দফতরে পাকিস্তানি সেনাদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখেও বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রথমে আত্মসমর্পণে রাজি হননি। রাইফেল তাক করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তারা। কিন্তু শত্রুর ট্যাঙ্ক আর ভারী মেশিনগানের ক্রমাগত গুলির মুখে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে যায় সব ব্যারিকেড। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশ সদর দফতর। সেখান থেকে ঘাতক বাহিনী এগুতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে। পরে রাতভর গোটা রাজধানীতেই অতর্কিতে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা।
অবশ্য এ পরিস্থিতিতেও রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাঙালি ছাত্র-জনতা। ঢাকার ফার্মগেট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চারপাশেই ছিল এ প্রতিরোধ। প্রতিরোধ ছিল চট্টগ্রামেও। কিন্তু এসব প্রতিরোধ ঠেকাতে পারেনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যা।
বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচি :২৫ মার্চ রাত ১১টা ৫৮ মিনিট থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত নিষ্প্র্রদীপ কর্মসূচি ছাড়াও শিখা চিরন্তনে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম রাত ১২টায় 'আলোর যাত্রার প্রতীক' মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করবে। ১২টা ১ মিনিট থেকে ১২টা ২ মিনিট পর্যন্ত পালন করা হবে স্বাধীনতার শব্দতরঙ্গ। রাত ১২টা ২ মিনিটে শিখা চিরন্তন বেদিতে তরুণ প্রজন্মের হাতে মশাল ও জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করবেন সেক্টর কমান্ডার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ৮টায় গণহত্যার ৪২তম বছরে ৪২টি মশাল প্রজ্বালন করে আলোর মিছিল বের করবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা গ্রহণের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অতিথিরাসহ মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধারা এই আলোর মিছিলে অংশ নেবেন। গণজাগরণ মঞ্চও এসব কর্মসূচিতে অংশ নেবে।
কালরাত্রির স্মরণ এবং বর্তমানে সাম্প্রদায়িক হামলা রুখে দেওয়ার প্রত্যয়ে ২৫ মার্চ বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। এ ছাড়া মানিক মিয়া এভিনিউতে আজ সূর্যাস্ত থেকে ২৬ মার্চ সূর্যোদয় পর্যন্ত পথচিত্রাঙ্কন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, গণসঙ্গীত ও কবিতা পাঠের কর্মসূচি পালন করবেন ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের (ইউডা) শিক্ষার্থীরা।