১৩ নভেম্বর, ২০১০

দয়াল নেও না সুপথে

ei“Y k¼i
শোনা যায়, যান্ত্রিক সভ্যতা যত এগোয় সভ্য মানুষ তত কৃত্রিম হতে থাকে। তার মুখে এঁটে
বসে এক মুখোশ। শিষ্টতার, সৌজন্যের। পরে অনেক চেষ্টা করলেও তার সত্যিকারের মুখশ্রী আর দেখা যায় না, তিনি নিজেও এমনকি দেখতে পান না। বলা হয় গ্রামের মানুষ নাকি অন্যরকম। সভ্যতার কৃত্রিমতার আঁচ যদিও তাদের গায়ে লাগছে একটু-আধটু, তবু তারা সরল প্রাণবন্ত আতিথ্যপ্রবণ।
এ সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা মিশ্র ও ভিন্নতর। অন্তত শতকরা আশিভাগ গ্রামবাসীর মনের কথা টের পাওয়া যে খুব কঠিন, তা আমি বলতে পারি। তাদের মুখের মুখোশ নেই, কিন্তু আছে এক কাঠিন্যের আবরণ। আপাত সারল্যের অন্তরালে সেই কঠিনতা প্রায় দুস্পপ্রবেশ্য। তবে একবার সেই শক্ত খোলা ভাঙতে পারলে ভেতরে দেখা যাবে নারকোলের মতোই বড় স্নিগ্ধ শাঁসজল। কয়েক শতাব্দীর তিক্ত লেনদেন, ব্যর্থ আশ্বাস আর নির্লজ্জ শোষণ গাঁয়ের মানুষকে শহুরে বাবুদের সম্পর্কে করে তুলেছে সন্দিহান। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাদের দেখা জানা আর শহরের মানুষের বইপড়া তত্ত্বে এত ফাঁক তারা দেখতে পায় যে, আমাদের জন্য তারা সব সময় রেখে দেয় এক অন্তর্লীন করুণা বোধ। তাদের মূঢ় ম্লান মূক মুখে ঢাকা আছে এক দারুণ কৌতুক। যার বিনিময় তারা নিজেদের মধ্যে করেন অবসর সময়ে। তাদের এই কৌতুক আর করুণা প্রকাশ পায় বাক্যে। ‘সাহেবের কি আমাদের মোটাচালে পেট ভরবে?’ ‘এই গেরামে কী আর দ্যাখবেন? গরমকালে ধুলা আর বর্ষাকালে কাঁদা কিংবা হঠাৎ যন্তর আনলেন যে? আমাগো গাইয়া গানে কি আপনাদের মন ভরবে?’ অথবা ‘আপনারা ঘন ঘন গেরামে আসলে আমাগো ভয় লাগে, কোন তালে কে আসতেছে কে জানে?’ এসব বাক্যবন্ধে খুব কায়দা করে মেশানো আছে চাপা কৌতুক আর নীরব অট্টহাসি।
লোকসংস্কৃতি নিয়ে যার সরেজমিন ঘোরার অভিজ্ঞতা আছে তিনিই বুঝবেন আমার ধারণার মূল কথা। একটা দারুণ প্রতিরোধ আর অবিশ্বাস তাদের পার হতে হয়েছে। সেখানে অভ্যর্থনা জোটে, আহার-বাসস্থানও। কিন্তু সন্দেহ থাকে সদা উদ্যত। একটা ভয়। এই বুঝি কিছু বেরিয়ে গেল তাদের। ছেউরিয়ার বাজারে আমাকে একজন বলেছিলেন, ‘আপনাদের রবীন্দ্রনাথ আমাদের লালন শাঁইয়ের গান নকল করে কি একটা প্রাইজ নেছেন? সে নাকি লাখ টাকার মামলা।’
এ যদি হয় সাধারণ মানুষের বক্তব্য আর ধারণা, তবে অসাধারণদের অব্যক্ত বিশ্বাস আর নাইবা বললাম। কিন্তু আমার কাজটা ছিল আরও কঠিন জায়গায়, উদাসীন-ফকির-বাউলদের সঙ্গে। আমার দেশে মেহেরপুর, কুষ্টিয়ায়, পশ্চিমবঙ্গে নদীয়া বর্ধমান মুর্শিদাবাদ। অনেক গ্রাম। তার মধ্যে আত্মগোপন করে থাকা কত উপধর্ম। অক্ষয় কুমার দত্ত যাদের বলেছেন ‘উপাসক সম্প্রদায়’। এইচএইচ উইলসন বলেছেন, একশ’ বছর আগে ‘মাইনর রিলিজিয়াস সেক্টস’। একশ’ বছর আগে তাদের লেখা পড়ে জানতে ইচ্ছে করেছিল ওই সম্প্রদায় এখন কী অবস্থায় আছে। ওদের ভাষা জানতাম না। কারণ ওদের ভাষাটা ছিল সন্ধ্যা। অর্থাৎ বাইরের মানে ও ভিতরের মানে একেবারে আলাদা।

একজন সাধককে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি বাউল? তিনি উত্তর দিলেন, আমি সংসার করি নাই। আবার প্রশ্ন : আপনি তো ফকির? আপনার ছেলেমেয়ে? উত্তর : সন্তান? পাঁচ হাজার। আমার পাঁচ হাজার শিষ্য শাবক। তারাই সন্তান। জানেন না ফকিরি দণ্ড নিলে আর সন্তান হয় না। শিষ্য সেবক নয়, শিষ্য শাবক। ফকিরি দণ্ড বস্তুটি কী? বাউল কি সংসার করে না?
একজন উদাসীনকে আমি জিজ্ঞেস করি : আজ কী খেলেন? উত্তর : খাওয়া নয়, বলুন সেবা। আজ সেবা হলো পঞ্চতত্ত্ব। প্রশ্ন : পঞ্চতত্ত্ব মানে? সে তো চৈতন্য নিত্যানন্দ অদ্বৈত....। উত্তর : আরে না না, পঞ্চতত্ত্ব মানে চাল, ডাল আর তিন রকমের আনাজ।
এক আখড়ায় খুব ফিসফিস করে এক গুরুস্থানীয় উদাসীনকে জিজ্ঞেস করলাম : একটা গানে শুনলাম ‘ভগলিঙ্গে হলে সংযোগ/সেই তো সকল সেরা যোগ।’ তার মানে? এখানে কি মৈথুনের কথা বলা হচ্ছে? একগাল হেসে উদাসীন বললেন : মৈথুন? হ্যাঁ, মৈথুনই তো? তবে কি জানেন, এর মানে আলাদা।’ এবার বুঝলেন?
বুঝলাম যে এতদিন ভুল বুঝছিলাম।
এ তো গেল ভুল বোঝা। মুশকিল আসবে আরেকদিক থেকে। যদি প্রশ্ন করা যায়, আপনি কি বাউল সম্প্রদায়ের? উত্তর পাওয়া যাবে, তা বলতে পারেন। আবার যদি ওই উদাসীনকে জিজ্ঞেস করি, আপনি ফকির? উত্তর হবেÑ হ্যাঁ, ফকিরও বটে। এবারে অসহিষ্ণু হয়ে প্রশ্ন করতে হয়, আমি যা-ই জিজ্ঞেস করি আপনি হ্যাঁ বলেন। আপনি সত্যি কি বলুন তো? উত্তর মিলবে, আমি মানুষ। মানুষ ভজা।
এসব কথার স্পষ্ট মানে কি? আমরা কি সিদ্ধান্ত নেব? আসলে সব উদাসীনের সাধনের মূলকথা গোপনতা। অসম্প্রদায়ীদের কাছে হয় কিছু বলে না, কিংবা উল্টাপাল্টা বলে বিভ্রান্তি এনে দেয়। ওরা একে বলে আপ্ত সাবধান। এর মূল বক্তব্য হলো, আপন সাধন কথা/না কহিও যথাতথা/আপনারে আপনি তুমি হইও সাবধান। আরেক রকম আছে ধন্দবাজি। একজনকে পেয়েছিলাম, ইমানালি শাহজী ফকির। তারা খাতা খুলে বললেন : লিখুন। কারের খবর। অন্ধকার, ধন্ধকার, কুয়াকার, আকার, সাকার, ডিম্বাকার, নিরাকার, শূন্যাকার, হাহাকার, হুহুকার, নৈরাকারÑ এই হলো এগার কার আর চার কার গোপন। আমি জানতে চাইলাম, এসবের মানে কী? মুরব্বির চালে মাথা নেড়ে শাহজী বললেন, এসব নিগূঢ় তত্ত্ব। আপনি বুঝবেন না।
আসলে শাহজীও কিন্তু কিছু জানেন না। কথাগুলো কোথা থেকে টুকে রেখেছেন। শহুরে পণ্ডিতম্মন্যরা যেমন কথায় কথায় সার্তর কামু আওড়ায়। এইসব উপধর্মের সন্ধানে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি তখন উল্টাপাল্টা সব দেখেশুনে চমকে যেতাম। সবচেয়ে বেকুব বনতে হতো গানের আসরে। হয়তো মচ্ছবের শেষে সারারাত চলল গানের আসর। শ’য়ে শ’য়ে মানুষ বসে সে গান শুনছে মৌজ করে, গায়ক গাইছে প্রাণ খুলে। আর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ তকমাধারী অথচ সে গানের বিন্দু-বিসর্গ বুঝি না। এসব গানকে বলে ‘শব্দ গান’। একজন প্রথম গানে তত্ত্বকথা তোলে প্রশ্নের আকারে, আরেক গায়ক তার জবাব দেয় আরেক গানে। প্রথম গানকে বলে ‘দৈন্যতা’, জবাবী গানকে বলে ‘প্রবর্ত’। পরে দেখেছি এসব নিগূঢ় ভাষার প্রয়োগ লাগসই করতে পারলে ফলও মেলে হাতেনাতে। একদিন এক গ্রামের পানের দোকানে এক বাউল রেকর্ডের জনপ্রিয় গান গাইছিল। আমি ফস করে বলে বসলাম, ওসব ফকিরকারি রসের গান গেয়ে কি হবে সাঁই, একটা দৈন্যতার গান হোক।
ব্যস কেল্লা ফতে। গায়কের চোখেমুখে আমার সম্পর্কে সে কী শ্রদ্ধা জানান। যেন দরদী পেয়েছে মরমীকে। বলেই বসল : আহা কি মান্যমান। শোনেন, ‘তবে আগে শান্তিপুরে চলোরে মন তবে গুপ্তিপাড়ায় যাবি।’
আমি সেই ভিড়ের দিকে সগর্বে তাকালাম। ভাবখানা যেন, দেখলে আমার এলেম। আমি জানি এ গানের মর্ম। এ গানে বলা হয়েছে, দেহমনকে শান্ত করলে তবে গুপ্তিপাড়া অর্থাৎ গুপ্ততত্ত্ব জানা যাবে। এমনি করে আমি জানতে পারি। অমাবস্যা মানে নারীর ঋতুকাল। কুমারী মানে কাম। লতা মানে সন্তান। চন্দ্র সাধন মানে মলমূত্র পান ইত্যাদি।
শানু ফকির বলেছিল, নিজের শরীরের বস্তু কি ঘেন্নার জিনিস? বস্তু রক্ষা আমাদের ধর্ম। সন্তান জন্ম মানে আপ্তমরণ, নিজেকেই মারা। সন্তান জন্ম দেওয়া চলবে না। তবে পতন কি নেই? আছে। যাদের কাম মরেনি তারা বারে বারে জন্মদ্বারে যায়। তাই বলে নারী আমাদের জন্য ত্যক্ত নয়। নারীকে নিয়েই আমাদের সাধনা। বিন্দুসাধন। যাকে বলে রসের ভিয়ান। দুধ জ্বাল দিয়ে দিয়ে যেমন ক্ষীর তেমনই। আর ওথলায় না। কামকে তেমনই পাকে চড়িয়ে শান্ত করতে হবে। আমাদের আপ্তজ্ঞানে বলে : আপন জন্মের কথা জানরে ভাই/সকল ভেদ সেই তো জানে তার তুলনা নাই/রজবীর্য রসের কারণ/এ দেহ হইল সৃজন/যারে ধরে সৃজন পালন তারে কোথা পাই? সেই আসল মানুষ সাঁইকেই আমরা খুঁজি। বুঝলেন এবার?
লোকধর্ম নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বুঝেছি তার অনেকটা হেঁয়ালি, বেশ কিছুটা শহুরে অজ্ঞ লোককে বোকা বানানোর চটকদারি, কিন্তু ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষটিকে ঘা দিতে পারলে বেরিয়ে আসে চাহিদার অতিরিক্ত রসদ।
এজন্য শিখতে হয় তাদের সাংকেতিক ভাষা। জানতে হয় লোকধর্মে ‘দীক্ষা’। একবার এক বাউল আমাকে পরীক্ষা করার জন্য প্রশ্ন করেছিলÑ মাটির কাজ বোঝ?
আমি বলেছিলামÑ হ্যাঁ, নালের কাজও বুঝি।
আমার দ্বিতীয় কথাটিতে কাজ হলো খুব। তখন বাউল আরও অনেক কথা আমাকে জানিয়ে দিল।
লোকধর্মের গুপ্ত ঘরানা; তার মানে, আলাদা কতগুলো ‘বন্দিশ’ আছে। তার কেতা সহবৎ ঘা জানা থাকলে ওস্তাদ মুখ খুলবেন না। লোকধর্মের ‘আসলী বিজ’ সংগ্রহ করা কঠিন, আবার সময় বিশেষে খুব সহজ। আমার এমন একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, আমি তখন মারফতি ফকিরদের মূল রহস্যগুলো বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। আমাদের বেশিরভাগ লৌকিক ধর্মের মূলে আছে ব্রাহ্মণ আর বেদ বা শাস্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। ব্রাহ্মণকে পুজো করে আর শাস্ত্র আউড়ে যে পরমতমকে পাওয়া যায় না একথা প্রায় সব লৌকিক ধর্মের মূল বিশ্বাস। তারা বলে চিনি কথাটা কাগজে লিখে চাটলে কি তার মিষ্ট বোঝা যায়? তেমনি পুঁথিতে ঈশ্বরের কথা লিখে তা আওড়ালে ঈশ্বরকে বোঝা যাবে না। তাকে নিজের মধ্যে খুঁজে নিতে হবে। ফকিররাও এমনই খাঁটি শরিয়তি মুসলমানের আচারসর্বস্বতা মানে না, মানে না মৌলবাদীদের ফতোয়া।
শরিয়তের নির্দেশ হলো, নিষ্ঠাবান মুসলমানকে করতে হবে পাঁচটি আবশ্যিক কর্ম। কলেমা, রোজা, হজ, নামাজ, জাকাত। মারফতি ফকিররা আচারের চেয়ে হৃদয়কে বড় বলে মানে। শাস্ত্রের চেয়ে মানুষ। দুঙ্গু সাঁইয়ের একটি পদে তাই বলা হয়েছে, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে শরা ধরে কে পায় তারে?’ এখানে শরা মানে শরিয়ত। যারা শাস্ত্রবিরোধী তারা নিজেদের বলে বেশরা ফকির।
এসব ফকির তাই শরিয়তি নয়, মারফতি। হৃদয়ের মারফতে মুর্শিদের নির্দেশে তাদের আত্মানুসন্ধান।
এবারে আমার অভিজ্ঞতাটার কথা বলি। ১৯৮০ সালের দিকে। শেওড়াতলার মেলায় প্রায় নিশিরাতে দুই ফকিরের তত্ত্ব আলোচনা শুনেছিলাম। অম্বুবাচীর ক্ষান্ত বর্ষণ রাত। জাহান ফকির আর শুকুর আলী কথা বলছিলেন। আমি চুপ করে শুনছিলাম। পরে দিনের আলো ফুটতে জাহান ফকিরের সঙ্গে আলাপ হলো। বাড়ি বর্ধমানের সাতগেছিয়ায়। লেখাপড়ার হিসেবে প্রায় মূর্খ। একেবারে গরিব। পোশাক-আশাক আলখেল্লা তেমনই মলিন। কিছুতেই আমার কাছে মন খুলবে না। কেবল ধানাই-পানাই। শেষ চালে চটিয়ে দেওয়ার জন্য বলে বসলাম : আপনারা তো বেশরা, শরিয়ত একেবারে বাদ দিয়ে, ভুলে গেলে, তবে কি মারফতি কবুল হবে?
মুখ চোখ প্রথমে ব্যথায় ভরে উঠল, তারপর হঠাৎ সত্যের ঝিলিকের মতো আলো খেলে গেল মুখে। আস্তে আস্তে জাহান বললেন, আপনি শিক্ষিত লোক, এসব কি বলছেন? শরিয়ত ভুলে মারফত? আপনি তো বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগ পড়েছেন, তারপরে তো দ্বিতীয় ভাগ? তাহলে কি আপনি প্রথম ভাগ ভুলে গেছেন?
বিদ্যুৎ চমকের মতো কথা এবং লেখাপড়া বিষয়ে মূর্খ লোকের মুখে। আমি অনেকক্ষণ অবাক হয়ে রইলাম। চকিতে বুঝলাম শরিয়ত হলো গবধহং আর মারফত হলো ঊহফ। সাহস পেয়ে বললাম : আপনারা শাস্ত্র মানেন না বুঝলাম। জাতি মানেন না কেন? তার যুক্তি কী?
খুব ধীর কণ্ঠে গুনগুন করে জাহান গাইতে লাগলেন বামুন বলে ভিন্ন জাতি/সৃষ্টি কি করেন প্রকৃতি? তবে কেন জাতির বজ্জাতি কর এখন ভাই/বল্লাল সেন শয়তানী দাগায়/গোত্রজাত সৃষ্টি করে যায়/বেদান্তে আছে কোথায় আমরা দেখি নাই।
আমি বললাম, খুব তো বামুনদের দাগালেন। মুসলমানদের বেলায়? নীরব হাসিতে মুখ ভরিয়ে নির্মীল চোখে জাহান আরেক গান ধরলেন : মুসলমানে ভাবে আল্লাহ আমাদের দলে/এমন বোকা দেখেছ কে কোন কালে/আল্লাহ কারো নয় মোসা খুড়ো/এই কথাটির পেলিনে মুড়ো/চুল পেকে হলিরে বুড়ো খবর না নিলে। বেশ ভালো লাগল মন ভরে উঠল। জাহান যেন বেশ মেজাজ পেয়ে বলে যেতে লাগলেন আপনে মনে : শান্তর মানুষ তৈরি করেছে। জাতি ও মানুষ তৈরি করেছে। হিন্দুদের মধ্যে বামুন-কায়েত, মুসলমানদের মধ্যে সৈয়দ-খোন্দকার এসব বড় রটালে কে? আমাদের দুঙ্গুর গানে বলে : অজ্ঞ মানুষে জাতি বানিয়ে/আজন্ম ঘুরিয়ে মরে স্বজাতি খুঁজিয়ে/শিয়াল কুকুর পশু যারা/এক জাতি এক গোত্র তারা/মানুষ শুধু জাতির ভারা মরে বইয়ে।
সেই জন্যই আমরা সতিকারের মানুষ খুঁজি। সে মানুষ বৈধিকে নেই, শরায় নেই, শাল গ্রাম শিলায় নেই, নোড়ায় নেই, মন্দিরে নেই, মসজিদে নেই। যে খোঁজে মানুষে খোদা সেই তো বাউল।
আমি বললাম : তা হলে উচ্চবর্ণ বাতিল? শাস্ত্র খারিজ?
: আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাদের কাছে বাতিল আপনারা থাকুন আপনাদের জাতিত্ব নিয়ে, শাস্ত্র আউড়ে মৌলবী আর বামুনের বিধান মেনে। আমরা জাতি মানিনে। আমরা বিশ্বাস করি সাধারণ মানুষের মধ্যে, দীন দরিদ্রের মধ্যে আছেন দীনবন্ধু। শুনুন এই গান :
ছোট বলে ত্যাজো কারে ভাই/হয়তো ওর রূপে এলেন ব্রজের কানাই/শূদ্র চাঁড়াল বাগদী বলার দিন/দিনে দিনে হয়ে যাবে ক্ষীণ/কালের খাতায় হইবে বিলীন দেখছি রে তাই।
এ গানের ভবিষ্যৎ বাণী আজকে প্রায় সত্য। শূদ্র চাঁড়াল বলার দিন সত্যিই শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু এসব গানের মধ্যে যে প্রতিবাদ, যে রুখে দাঁড়ানো, তার মধ্যেও একটা জাতিত্বের নেশা আছে। ওই জাতিত্বের নেশাও একসময় ছুটে যায় যখন মিলন হয় পরমাত্মার সঙ্গে। আর তাই ক্ষ্যাপা মানুষটা বারবার বলে, দয়াল, নেও না সুপথে।


আঠার শতকের শেষ দিকে অবিভক্ত বাংলায় শতাধিক উপধর্ম বিরাজিত ছিল। বেদ, পুরাণ, ব্রাহ্মণ, মন্দির, বৈধেয় সাধনা সবকিছু খারিজ করতে করতে এই উপধর্মগুলো জেগে উঠেছিল। ‘বৈষ্ণব ব্রত দিন নির্ণয়’ পুস্তকে প্রায় ১০৩টি উপধর্মের উল্লেখ রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান প্রধান উপধর্মগুলো হলো বাউল, ন্যাড়া, দরবেশ, সাঁই, আউল, সহজিয়া, রাধাশ্যামী, রামসাধনীয়া, দাদুপন্থি, রুই দাসী, সেনপন্থি, মীরাবাঈ, কর্তাভজা, রামবল্লভী, সাহেবধনী, বলরামী, হজরতী, পাগলনাথী, বড়ী, রাধা বল্লভী, চরণদাসী, হরিশ্চন্দ্রী, সাধনপন্থি, বৈরাগী, নাগা, আখড়া, দুয়ারা, মটুকধারী, সংযোগী, জনমোহিনী, হরিবোলা, রাতভিখারী, যোগী, রামপ্রসাদী, নস্করী, সৎনামী, মালী, অবধূতী, কিশোরীভজনী, নেমো বৈষ্ণব, দশামার্গী, ফকির দাসী, খাকী ও মুকুলদাসী প্রভৃতি।
এত উপধর্ম সম্প্রদায় ছিল এ দেশে। কিন্তু এখন এরা গেল কোথায়? সম্ভবত উনিশ শতকের হিন্দু ও মুসলিম সংস্কার আন্দোলন, মিশনারিদের প্রচার, ব্রাহ্মধর্মের উত্থান এবং শ্রী রামকৃষ্ণ বিজয়কৃষ্ণ জীবন সাধনা এমন প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে যে, এই সব উপসম্প্রদায়ী পিছু হটতে হটতে গ্রামের প্রত্যন্তে লুকিয়ে পড়ে। একদিকে উচ্চ ধর্মাদর্শ, আরেকদিকে কট্টর মুসলমানদের সক্রিয় দমননীতি বাউল ফকিরদের ধ্বংস করে দিল অনেকটা। শ্রী রামকৃষ্ণ তো এসব লোকায়ত ধর্ম সাধনাকে সরাসরি অভিযুক্ত করে বললেন : বাড়িতে ঢোকার দুটো পথÑ সদরের খোলা দরজা আর পায়খানা দিয়ে ঢোকা। সদর দিয়েই ঢোকা ভালো, পায়খানা দিয়ে ঢুকলে গায়ে নোংরা লাগা স্বাভাবিক। তার মতে, কামিনী কাঞ্চনের সাধনা বিপজ্জনক।
শ্রী সদগুরু সঙ্গ দ্বিতীয় খণ্ডে ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ডায়েরিতে বিজয়কৃষ্ণ বলেছেন, ‘বাউল সম্প্রদায়ে অনেকস্থলে বড়ই জঘন্য ব্যাপার। তা আর মুখে আনা যায় না। ভালো ভালো লোকও বাউলদের মধ্যে আছেন। তারা সব চন্দ্রসিদ্ধি করেন। শুক্রচান্, শনিচান্, গরল চান্, উন্মাদ চান্Ñ এই চার চান্ সিদ্ধি হলেই মনে করেন সমস্ত হলো।.....আমি বললাম ‘ওটি আমি পারব না। বিষ্ঠামূত্র খেয়ে যে ধর্ম লাভ হয়, তা আমি চাই না।’ মহান্ত খুব রেগে উঠে বললেন, ‘এতকাল তুমি আমাদের সম্প্রদায়ে থেকে আমাদের জেনে নিলে, আর এখন বলছ সাধন করব না। তোমাকে ওসব করতেই হবে।’ আমি বললাম ‘তা কখনই করব না।’ মহান্ত শুনে গালি দিতে দিতে আমাকে মারতে এলেন, শিষ্যরাও ‘মার মার’ শব্দ করে এসে পড়ল। আমি তখন খুব ধমক দিয়ে বললাম। বটে এতদূর স্পর্ধা, মারবে? জান আমি কে? আমি শান্তিপুরের অদ্বৈত বংশের গোস্বামী, আমাকে বলছ বিষ্ঠামূত্র খেতে? আমার ধমক খেয়ে সকলে চমকে গেল। উচ্চস্তরের হিন্দু সাধকদের এই সব প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ নানা ধরনের উপধর্মের লোকদের যতটা কমজোরী করে দিয়েছিল তার চতুর্গুণ লড়াই হয়েছিল ফকির দরবেশদের সঙ্গে নিষ্ঠাবান মুসলমানদের। বাংলার সামাজিক ইতিহাস যারা লিখেছেন তারা এসব ঘটনা, কেন জানি না, এড়িয়ে গেছেন।
হিসেব নিলে দেখা যাবে, শেষ আঠার শতকে পূর্ব ও উত্তরবঙ্গে বিপুল পরিমাণ শূদ্র ও গরিব মুসলমান বাউল বা ফকিরী ধর্মে দীক্ষা নিয়ে বৃহত্তর হিন্দু ও মুসলিম সমাজ ত্যাগ করতে থাকে। দেখা যায়, বাউল ফকিরদের মধ্যে মুসলমান ধর্মত্যাগীদের সংখ্যা ছিল খুব বেশি। লালন শাহ থেকে আরম্ভ করে বহুসংখ্যক উদাসীন ধর্মগুরু তাদের সৎ জীবনযাপন, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ প্রচার এবং সমন্বয়বাদী চিন্তাধারায় বহু সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করে নেন তাদের উপধর্মে। ‘পাষ দলন’ জাতীয় বৈষ্ণবীয় বুকলেট বেরোয় অজস্র, যাতে কর্তাভজা ও অন্যান্য উপসম্প্রদায়দের আক্রমণ করা হয় ‘অনাচারী’ ‘ভ্রষ্ট’ ‘নিষিদ্ধাচারী’ আখ্যা দিয়ে তাদের নারী ভজন ও সহজিয়া সাধনতত্ত্বকে অপব্যাখ্যা করে। উনিশ শতকে দাশরথি রায় তার পাঁচালীতে গালমন্দ করলেন এসব সম্প্রদায়কে। কলকাতায় জেলেপাড়ায় সং বেরুলো কর্তাভজাদের ব্যঙ্গ করে।
শাস্ত্রবিরোধী বাউলদের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম শুরু হলো উনিশ শতকে নদীয়া, যশোর ও উত্তরবঙ্গের শরীয়তী মুসলমানদের সঙ্গে। বাউলদের অন্যান্য আচরণের, যেমন চারিচন্দ্রের সাধনা, ঘৃণ্যতার বিবরণ দিয়ে শরীয়তবাদীরা বেশি জোর দিলেন বাউলদের গান গাওয়ার বিরুদ্ধে। বাউলদের গানের আসরে তারা দাঙ্গা বাধালেন। আলেম সম্প্রদায়ের নির্দেশে বাউলদের ওপর নানা রকম দৈহিক নিপীড়ন শুরু হলো এবং প্রায়ই তাদের ঝুঁটি কেটে নেওয়া হতে লাগল (এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য। ‘বাঙলায় বাউলবিরোধী আন্দোলন : প্রেক্ষিত লালন শাহ’ আবুল আহসান চৌধুরীর এই বইটি গুরুত্বপূর্ণ)। ভয়ে বাউলরা আত্মগোপন করল বা বহির্বাস ত্যাগ করল।
লোককবি জোনাবালী হুঙ্কার দিয়ে লেখেন : লাঠি মারো মাথে দাগাবাজ ফকীরের। রংপুরের মাওলানা রেয়াজউদ্দীন আহমদের লেখা ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’ বইটি খুব জনপ্রিয় হয়। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি লিখেছেন : ‘এই বাউল বা ন্যাড়া মত মোছলমান হইতে দূরীভূত করার জন্য বঙ্গের প্রত্যেক জেলায়, প্রত্যেক গ্রামে, মহল্যা জুমা ও জমাতে এক একটি কমিটি স্থির করিয়া যতদিন পর্যন্ত বঙ্গের কোন স্থানেও একটি বাউল বা ন্যাড়া মোছলমান নামে পরিচয় দিয়া মোছলমানের দরবেশ ফকীর বলিয়া দাবি করিতে থাকিবে ততদিন ঐ কমিটি অতি তেজ ও তীব্রভাবে পরিচালনা করিতে হইবে। মোটকথা মোছলমানগণের কর্তব্য এই যে, মোছলমান সমাজকে বাউল ন্যাড়া মত হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত না করা পর্যন্ত বিশেষরূপে চেষ্টা করিতে হইবে।’

এমন বিবরণ প্রচুর মেলে। বাউল ফকিরদের বিরুদ্ধে আক্রমণ ও অপপ্রচার উনিশ শতকের সীমান্ত পেরিয়ে বিশ শতকে ব্যাপ্ত হয়। ‘বাউল ধ্বংস ফৎওয়া’ বই থেকে জানা যায়, অবিভক্ত বাংলায় ষাট সত্তর লক্ষ বাউল ছিল। উৎপীড়ন ও অত্যাচারে তারা সম্প্রদায়গতভাবে শীর্ণ ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ১৩৫৩ বঙ্গাব্দে মাওলানা আফছার উদ্দীনের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি কুষ্টিয়ায় ছেঁউরিয়া আশ্রমে সমবেত লালনপন্থি সমস্ত বাউলের চুলের ঝুঁটি কেটে নেয়। সত্তর দশকেও মুর্শিদাবাদ জেলার নওদা থানায় মন্টু খাঁ নামে এক ব্যক্তি বাউলদের ঝুঁটি কেটে নিচ্ছে এমন খবর কলকাতায় কাগজে ছাপা হয়েছে। এ ঘটনার বিরুদ্ধে মরমী উদাসীনদের ক্ষোভ ও বেদনা আমি নিজে শুনেছি।
তবে সব মুসলমান বাউলবিরোধী ছিলেন এমন ভাবারও কারণ নেই। ১৯২৭ সালে ফরিদপুরের মুসলিম ছাত্র সমিতির বার্ষিক অধিবেশনের মুক্তবুদ্ধি মনীষী কাজী আবদুল ওদুদ বলেন, ‘ইসলাম কীভাবে বাঙালীর জীবনে সার্থকতা লাভ করবে, তার সন্ধান যতটুকু পাওয়া যাবে বাংলার এই মারফৎপন্থীর কাছে ততটুকুও পাওয়া যাবে না বাংলার মাওলানার কাছে, কেননা সমস্ত অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও মারফৎপন্থীর ভিতরে রয়েছে কিছু জীবন্ত ধর্ম, সৃষ্টির বেদনা, পরিবেষ্টনের বুকে সে এক উদ্ভব, আর মাওলানা শুধু অনুকারক, অনাস্বাদিত পুঁথির ভাণ্ডারী সম্পর্কশূন্য ছন্দোহীন তার জীবন।    
এই মারফৎপন্থীদের বিরুদ্ধে আমাদের আলেম সম্প্রদায় তাদের শক্তি প্রয়োগ করেছেন আপনারা জানেন। ....আলেমদের এই শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে কথা বলবার চাইতে বড় প্রয়োজন এইখানে যে সাধনার দ্বারা সাধনাকে জয় করবার চেষ্টা তারা করেননি, তার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত দুর্বলকে লাঠির জোরে তারা দাবিয়ে দিতে চেয়েছেন। এ দেশে মারফৎপন্থীদের সাধনার পরিবর্তে যদি একটি বৃহত্তর পূর্ণতার সাধনার সঙ্গে বাংলার যোগ সাধনের চেষ্টা আমাদের আলেমদের ভিতরে সত্য হতো, তা হলে তাদের কাছ থেকে শুধু বাউল ধ্বংস আর নাসারা দলন ফতোয়াই পেতেম না।’
প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই দলনপীড়ন বাউল-দরবেশ-ফকিরদের দুর্বল ও দলছুট করে দিলেও একেবারে লুপ্ত করে দিতে পারেনি। কারণ নিচু সমাজের মানুষ অসাম্প্রদায়িকভাবে গ্রামীণ সমাজে সহজে মিলতে মিশতে পারে। খোঁজ করলে দেখা যাবে, অখণ্ড বাংলায় যত উপধর্ম সম্প্রদায় সহজে গজিয়ে উঠেছিল তাদের বেশিরভাগ প্রবর্তক একজন মুসলমান অথবা হিন্দু-মুসলমান যৌথভাবে। কর্তাভজাদের স্রষ্টা আউলে চাঁদ একজন মুসলমান আর তার প্রধান শিষ্য রামশরণ পাল একজন সদগোপ। সাহেবধনী সম্প্রদায়ের প্রবর্তক একজন মুসলমান উদাসীন এবং এ ধর্মের প্রধান সংগঠক চরণ পাল জাত গোয়ালা। আসলে বাংলার লৌকিক উপধর্মগুলোর ভিত্তিতে আছে তিনটি প্রবর্তনা মুসলমান বাউল ফকির দরবেশদের প্রত্যক্ষ প্রভাব, শোষিত শূদ্র বর্ণের ব্রাহ্মণ বিরোধ এবং লোকায়ত বৈষ্ণব ধর্মের আহ্বান। এই শেষ বিষয়টির একটি সামাজিক ব্যাখ্যা দরকার।
শ্রী চৈতন্য আমাদের দেশে এসেছিলেন এক সময়োচিত ভূমিকায় পরিত্রাতারূপে। তখন ষোড়শ শতকে মুসলমানের ব্যাপক হিন্দু ধর্মান্তকরণ রুখতে এবং শূদ্র বর্ণের ওপর শূদ্র ব্রাহ্মণদের অত্যাচার ঠেকাতে তিনি এক উদার সমন্বয়বাদী বৈষ্ণব ধর্মের পরিকল্পনা নেন। তার ধর্মসাধনের সরলতম পন্থা ছিল ‘হরের্নামৈব কেবলম’। এক বিপুল জনসন্নিবেশ বৈষ্ণব ধর্মকে বেগবান করে তোলে। কিন্তু শ্রী চৈতন্যের তিরোভাবের পরেই বৈষ্ণব ধর্মে ভেদবাদ জেগে ওঠে। বৃন্দাবনের গোস্বামীরা সংস্কৃতে শাস্ত্র বই লিখে চৈতন্যতত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় বেশি মনোযোগী হলেন। তার লোকশিক্ষা আর সাধারণ মানুষের সংরক্ষণের দিকটা হলো উপেক্ষিত। সাধারণ বৈষ্ণব মানুষ আর তাদের মুক্তিদূত শ্রী চৈতন্যের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো শাস্ত্র আর পুঁথি। অসহায় শূদ্ররা তখন ভ্রষ্টাচারে মগ্ন হলো। সেই সঙ্কটকালে নিত্যানন্দের ছেলে বীরচন্দ্র বা বীরভদ্র আরেকবার অবতার আর নেতারূপে দেখা দিলেন। পলাতক ভ্রষ্টাচারী বৌদ্ধ সহজিয়া, মিথুন সাধক মূর্খতান্ত্রিক আর অজ্ঞ মুমুক্ষু মানুষদের বীরভদ্র আবার বৈষ্ণব করলেন। এবারকার বৈষ্ণবায়নে এলো নানা লৌকিক গুহ্য সাধনা, নিশ্বাসের ক্রিয়া ও গোপন জপতপ। গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠল নতুন নতুন আখড়া ও শ্রী পাট। গঙ্গার ধারে ধারে পাটুলী কাটোয়া অগ্রদ্বীপ ধরে আস্তানা পাতল সহজিয়া বৈষ্ণবরা। বীরচন্দ্রকে তারা দেখল চৈতন্যের অবতার রূপে। নতুন নেতারা জয়ধ্বনি দিয়ে তারা ঘোষণা করল নতুন বাণী :
বীরচন্দ্র রূপে গুণ : গৌর অবতার/যে না দেখেছে গৌর সে দেখুক একবার।
কালক্রমে লোকগুরুরা গীতার ‘যদাযদাহি ধর্মস্য’ শ্লোকটি সামনে রেখে এমন একটা স্বতঃসিদ্ধ বানিয়ে ফেললেন যাতে শোষিত মানুষরা বিশ্বাস করে নিল কৃষ্ণের অবতার গৌরাঙ্গ, গৌরাঙ্গের অবতার বীরচন্দ্র। এই সূত্র অনুসরণ করে আমরা সকৌতূহলে দেখতে পাই কর্তাভজা ধর্মের প্রথমদিকের ঘোষণা ছিল : ‘কৃষ্ণ চন্দ্র গৌরচন্দ্র আউলে চন্দ্র/তিনিই এক একেই তিন।’ তার মানে বীরচন্দ্র সরে গিয়ে এলেন আউলে চন্দ্র। তৈরি হলো এক বৈষ্ণব বিশ্বাসী নতুন উপধর্ম। অচিরে সেই কর্তাভজাদের নেতৃত্বে এলেন দুলাল চন্দ্র পাল, যার মার নাম সরস্বতী, নতুন নামকরণ হলো সতী মা। সতী মা নামে শচীমার ধ্বনির আভাস তো স্পষ্ট। এর গায়ে গায়ে তৈরি হলো নতুন উচ্চারণ।
তিন এক রূপ/শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র শ্রীদুলাল চন্দ্র। এই তিন নাম বিগ্রহস্বরূপ কেমন সুপরিকল্পিতভাবে আউলে চন্দ্রকে সরিয়ে দুলাল চন্দ্র লোকমানসে আসন পাতলেন।
একশ’ বছর আগে অক্ষয় চন্দ্র যখন ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ বইটি লেখেন তখন বাংলার বিভিন্ন উপধর্মের হদিস দেন এবং একটি মোটামুটি প্রতিবেদন খাড়া করেন। মুশকিল যে, অক্ষয়কুমার নিজে সরেজমিন খুঁজে পেতে ঘুরে প্রতিবেদন লেখেননি। মোটামুটি খবর বিভিন্নজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে লিখেছিলেন। তাতে ভুল আছে, খণ্ডতা আছে। বরং অনেকটা ঘুরে বিবরণ লিখেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ তার ঐরহফঁ পধংঃবং ধহফ ংবপঃং বই লেখার সময়। মেহেরপুরে বলরামী সম্প্রদায়ের বিবরণ অক্ষয়কুমার নিতান্ত রৈখিকভাবে দিয়েছেন, অথচ বিদ্যাভূষণ স্বয়ং মেহেরপুরে গিয়ে বলরামের বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তবে লেখেন।
আমি ব্যক্তিগত পরিভ্রমণ এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে যা সংগ্রহ করেছি তাতে রয়েছে লৌকিক উপধর্মের সেই পরাক্রান্ততা, সভ্যতা-রাজনীতি-বিজ্ঞান-শাস্ত্র-নিপীড়ন যাকে আজও মারতে পারেনি। আমার পরিভ্রমণকাল ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০। আমি তখন কলকাতার দৈনিক সত্যযুগ পত্রিকার ফিচার রিপোর্টার। এই বিশাল ভূগোলে বৃত্তিহুদা বলে একটা গ্রাম আছে, এ ব্যাপারটাও ছিল অজানা। কৃষ্ণনগর থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় হাতেম আলি মোল্লা নামে একজনের ধারাবাহিক লেখা পড়ে জানতে পারি নদীয়ায় গত শতকে কুবির সরকার বলে এক বড় লোকগীতিকার ছিলেন। হাতেম আলির নিবন্ধে ব্যবহৃত তার গানের উদ্ধৃতি দেখে মনে হলো কুবিরের গান সংগ্রহযোগ্য। হাতেম আলির সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ করে একদিন হাজির হলাম নদীয়ার চাপড়া থানার বৃত্তিহুদা গ্রামে।
সেখানেই রামপ্রাসাদ ঘোষের বাড়িতে স্বচক্ষে দেখলাম তার ঠাকুর্দা রামলাল ঘোষের অনুলিখনে কুবির গোসাইয়ের ১২০৩ খানা গান। পরে তারা উৎসাহী হয়ে দেখালেন কুবির গোসাইয়ের সমাধি মন্দির, সেখানে তার স্ত্রী ভগবতী আর সাধন সঙ্গিনী কৃষ্ণমোহিনীর সমাধিও রয়েছে। উঁকি মেরে কুবিরের সমাধি ঘরে দেখলাম একটি মাটির ঢিবি, একটি সজ্জিত চৌকি ও বিছানা। ফুলের সাজি, ফকিরী দণ্ড, বাঁকা লাঠি, ত্রিশূল, খড়ম আর কাঠের পিঁড়ি।
: এসব তেনার ব্যবহার করা জিনিস, বললেন গোপাল দাস। এখনকার সেবাইত কুবিরের অধস্তন চতুর্থ পুরুষের বংশধর। কখনও সহজিয়া বৈষ্ণবদের সমাধি দেখিনি, কৌতূহল হলো। জিজ্ঞেস করলাম : মাটির ঐ উঁচু ঢিবিটা কেন?
: ঐখানে রয়েছে তেনার মাথা। জানেন তো আমাদের সমাধি হয় মাটি খুঁড়ে, তাতে শরীরকে হেলান দিয়ে সামনে পা ছড়িয়ে বসিয়ে।
আরও জানা গেল, ওই রামলালের খাতা থেকেই যে, কুবিরের জন্ম ১১৯৪ বঙ্গাব্দে ফাল্গুনী পূর্ণিমায়। মৃত্যু ১২৮৬ বঙ্গাব্দে ১১ আষাঢ় মঙ্গলবার রাত চারদণ্ডে শুক্লপক্ষে ষষ্ঠী তিথির মধ্যে। এবারে হাতেম আলি আমাকে দেখালেন কুবিরের গুরু চরণ পালের ভিটে। সবই দেখা হলো। শুধু বোঝা গেল না ১২০৩ খানা গানের লেখক কুবির গোসাইয়ের নাম কেন সর্বসাধারণের কাছে এত অজ্ঞাত। হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মতো দুটো ব্যাপার চোখের সামনে ধরা পড়ল কলকাতায়। ফিরে আসার মাসখানেকের মধ্যে। প্রথমত, ‘শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত’ পড়তে পড়তে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম প্রসিদ্ধ গান ‘ডুবডুবডুব রূপ সাগরে আমার মন’ কুবিরের লেখা। দ্বিতীয়ত, ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় (১৮৭০) পড়ার সময় চোখে পড়ল ‘সাহেবধনী’ সম্প্রদায় সম্পর্কে। ‘এই সম্প্রদায়ের স্রষ্টা দুঃখী রামপাল। তার পুত্র চরণ পাল এই সম্প্রদায়ের মতো বিশেষ রূপে প্রচার করিয়া অতিশয় বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছেন।.... কিছুদিন হইল চরণ পালের মৃত্যু হইয়াছে।’
আরও দুয়েকবার একাকী বৃত্তিহুদা গ্রামে ঘুরে বুঝলাম জলাঙ্গী নদীর পশ্চিমপারে দোগাছিয়া গ্রাম, পুবে বুড়িহুদা। চরণের পিতা ছিলেন দোগাছিয়ার মানুষ। জনৈক উদাসীনের কাছে তিনি দীক্ষা নেন এবং গড়ে ওঠে সাহেবধনী ধর্মমত। তার ছেলে চরণ পাল দোগাছিয়া থেকে বাস্তু তুলে আনেন পরপারে বৃত্তিহুদায়। এখানেই সাহেবধনীদের সাধনপীঠ আর আসন।


চরণের শিষ্যদের মধ্যে প্রধান ছিলেন কুবের সরকার। জাতে যুগী, পেশায় কবিদার। চরণের কাছে দীক্ষা নিয়ে কুবের হলেন গোঁসাই, বনে গেলেন তাত্ত্বিক গীতিকার। আর নদীয়ার নিজস্ব স্বরসঙ্গতির নিয়মে কুবেরের উচ্চারণ হলো কুবির। একজন গায়ক কুবিরের গান শোনালেন। সযতেœ টুকে নিলাম : ওরে বৃন্দাবন হ’তে বড় শ্রী পাট হুদা গ্রাম/যথা দিবানিশি শুনি দীনবন্ধু নাম॥ হোরি নীলাচলে যেমন লীলে/এখানে তার অধিক লীলে/হিন্দুযবন সবাই মিলে স্বচক্ষে দেখতে পেলাম॥ দ্যাখো গোঁসাই চরণ চাঁদ আমার/বসিয়েছে চাঁদের বাজার/ভক্তবৃন্দ আসছে যাচ্ছে অবিশ্রাম॥ আমার চরণ চাঁদের নামের জোরে/কত দুখী তাপী পাপী তরে/হাঁপ কাশি শুন গুড়ুম ব্যথা/মহাব্যাধি হয় আরাম॥
গানের শেষ স্তবক বেশ লক্ষণীয়। চরণপালের তাহলে ভেষজবিদ্যায় বেশ হাতযশ ছিল। সাহেবধনী মতে হিন্দু মুসলমান যে সমান মর্যাদায় রয়েছে তা বুঝতে দেরি হলো না। পরিসংখ্যান ঘেঁটে ১৯৭১-এর আদমশুমারিমাফিক এই রকম বিবরণ তৈরি করা গেলÑগ্রামের নাম বৃত্তি হুদা। থানা চাপড়া। জেলা নদীয়া। অবস্থান কৃষ্ণনগর শহর থেকে ১৬ মাইল উত্তর-পূর্বে। মৌজা নং ২৯। অধিবাসীদের জীবিকা কৃষিকর্ম, ব্যবসা ও শিক্ষকতা। মোট জনসংখ্যা ৩৪৫০ জন। মুসলমান ৫২৫ ঘর। ঘোষ ৬০ ঘর, কর্মকার ৮ ঘর। দাস ৪০ ঘর। প্রামাণিক ৬ ঘর। গড়াই ১০ ঘর। সূত্রধর ১ ঘর। যে গ্রামে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সেখানে বৈষ্ণব সহজিয়া কেন্দ্রিক একটা উপধর্ম কীভাবে টিকে আছে বিপুল গৌরবে, তা জানতে ইচ্ছে হলো। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার দ্বিজপদ প্রামাণিক বললেন বৈশাখী পূর্ণিমায় আসতে। ওই দিন চরণ পালের ভিটের মহোৎসব হবে।
গেলাম সেই মহোৎসবে। দেখলাম বৃত্তিহুদা আর আশপাশের অনেক গ্রামের মানুষ বিপুল উৎসাহে মেতে উঠেছে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে। তবে উচ্চ বর্ণের কেউ যে নেই সেটাও চাক্ষুষ হলো। সন্ধ্যার পর সারারাত চলল শব্দ গানের আসর। লালনের দৈন্যতার গানের জবাবে কুবিরের প্রবর্ত গান অনেকগুলো শোনার সুযোগ হলো। দেখলাম কুবিরের গান বেশিরভাগ গাইছে মুসলমান ফকির। জহরালি আর ছামেদ আলি। লোকে গানের ফাঁকে ফাঁকে হুঙ্কার দিয়ে উঠছে : ‘জয় দীনদয়াল জয় দীনবন্ধু।’
আমি ভাবছি লোকগুলো বুঝি হরিধ্বনি দিচ্ছে। দ্বিজপদ বাবু ভুল ভাঙিয়ে জানালেন, সাহেবধনীদের উপাস্যের নাম দীনদয়াল। এদের সম্প্রদায়কে বলে দীনদয়ালের ঘর। কখনও কখনও দীন দয়ালকে এরা দীনবন্ধুও বলে। এটা ওদের কোড ল্যাঙ্গুয়েজ।’
তাহলে সেদিন কুবিরের গানে যে শুনেছিলাম ‘ওরে বৃন্দাবন হতে বড় শ্রী পাট হুদা গ্রাম/যেথা দিবানিশি শুনি দীনবন্ধু নাম’Ñতাহলে সেই দীনদয়াল দীনবন্ধু। ক্রমে জানা গেল দীনদয়ালের ঘরে হিন্দু মুসলমান প্রায় সমান সমান। মোচ্ছবের সময় দেখলাম যে হিন্দুকে পরিবেশন করছে মুসলমান, মুসলমানকে হিন্দু। আসলে গেরুয়া বা কোনো বহির্বাস তো পরে না। গৃহী ধর্ম। যে কেউ নিতে পারে। আমাদের সাদা চোখে যাকে হিন্দু বা মুসলমান ভাবছি তারা কিন্তু এখানে বর্ণ হিন্দু বা শরীয়ত মুসলিম নয়। সকলেই সাহেবধনী। ততক্ষণে জহরালি নেচে নেচে গাইছে। এই ব্রজধামের কর্তা যিনি/সেই ধনী এই সাহেবধনী/রাইধনী এই সাহেবধনী। আশ্চর্য তো। ব্রজের রাইকে এরা সাহেবধনী বানিয়েছে। তার মানে এরা নারী ভজা সম্প্রদায়। এদিকে ছামেদ আলি গান ধরেছে, একের সৃষ্টি সব নারি পাকড়াতে/আল্লা আলজিহ্বায় থাকেন আপন সুখে/কৃষ্ণ থাকেন টাকরাতে।
এ সবই নাকি কুবিরের গান। আশ্চর্য সমন্বয়বাদের গান। এ গানের মূল তো দেখতেই হবে।
পাশ থেকে ধারা বিবরণীর মতো দ্বিজপদ মাস্টার মশাই বলে যাচ্ছেন : চরণপালের প্রধান শিষ্য ছিলেন তিনজন। রুকুনপুরের প্রহলাদ গোঁসাই, বামুন পুকুরের রামচন্দ্র গোঁসাই, আর হুদোর কুবির গোঁসাই। এদের মধ্যে গান লিখেছে শুধু কুবির। আহা কী গান।
জানতে চাইলাম : কুবিরের গানের শিষ্য নেই?
সে কী? আপনি যাদুবিন্দুর গান শোনেননি? এক্ষুনি শুনিয়ে দিচ্ছি। মস্ত বড় ভাবের কবি। কুবিরের প্রধান শিষ্য যাদুবিন্দু গোঁসাই। বাড়ি ছিল বর্ধমানের পাঁচলাখি গ্রামে। সে বাড়ি এখনও আছে। ওই দেখুন যাদুবিন্দুর দৌহিত্রের ছেলে দেবেন গোঁসাই। ও দেবেন, বলি এদিকে এসো।
বিনীত হেসে হাতজোড় ক’রে দেবেন গোঁসাই এসে দাঁড়ালেন। শীর্ণ চেহারায় টকটকে ফর্সা রঙ। বাবরি চুল। সাদা পাঞ্জাবি পরনে। জিজ্ঞেস করলাম : আপনাদের পাঁচলাখি গ্রামখানি কোথায়?
আজ্ঞে, নবদ্বীপের হিমায়েৎপুর মোড় থেকে বর্ধমান যাবার রাস্তা। সেই রাস্তায় নাদনঘাট ছাড়িয়ে ধাত্রী গ্রামের আগেই নাদাই ব্রিজ। তারই গায়ে আমাদের পাঁচলাখি। একদিন যাবেন তো?
: কী দেখব সেখানে?
: যাদুবিন্দুর সমাধি আছে। আর গানের খাতা। শত শত গান। দ্বিজপদ বললেন : ওহে দেবেন্দ্র, গোপালের মাকে ডাকো তো। এঁকে একখানা যাদুবিন্দুর গান শোনাব।
দেবেন্দ্র সেই ভিড়ে পথ খুঁজতে লাগলেন। দ্বিজপদ বাবুকে সেই ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম : যাদুবিন্দু আবার কী রকম নাম? যাদবেন্দ্রের স্বরসঙ্গতি নাকি?
: আরে না না। যাদু আর তার সাধনসঙ্গিনী বিন্দু, এই দুয়ে মিলে যাদুবিন্দু। ওই একখানা গানে আছে শুনেছেন, সর্বচরণে পাপীর এই নিবেদন তার মধ্যে আছে ‘যাদু বিন্দু এরাই দুজনা/পাঁচলাখি গাঁয় তার ঠিকানা।’ এবারে বুঝলেন তো যাদুবিন্দু নাম রহস্য?
এরই মধ্যে এসে গেল গোপালের মা। মধ্যবয়সী বিধবা। খুব লজ্জা পেয়ে গেছেন। ‘আমি কী গান করব বল দিনি বাবা? আমার কি আর সে গানের গলা আছে?’
দ্বিজপদ বললেন, ‘যা আছে ওতেই চলবে, নাও ধরো।’ আমাকে বললেন কুবিরের পোষ্যপুত্র কেষ্টদাস। এ তারই ছেলের বিধবা। বুড়ির গলা খুব মিঠে। যাদুবিন্দুর সঙ্গে এর খুব ভাব ছিল। যাদুবিন্দুর অনেক গান এর জানা আছে।
গোপালের মা মধুর কণ্ঠে গান ধরল :
যে ভাবেতে রাখেন গোঁসাই সেই ভাবেতেই থাকি/অধিক আর বলব কি? তুমি খাও তুমি খিলাও/তুমি দাও তুমি বিলাও/তোমার ভাবভঙ্গি বোঝা ঠকঠকি॥ গুরু দুখ দিতে তুমি সুখ দিতেও তুমি/কুনাম গুনাম সুনাম বদনাম সবই তোমারই/ও কুল আলম তোমারই ও কুদরত বিহারী/তুমি কৃষ্ণ তুমিই কালী তুমি দিলবারী॥ কখনও দুগ্ধ চিনি ক্ষীর ছানা মাখন ননী/কখনও জোটে না ফ্যান আমানি/কখনও আ-লবণে কচুর শাক ভখি॥ কহিছে বিন্দু যাদু তুমি চোর তুমিই সাধু/তাই তোমারে কুবির চাঁদ বলে ডাকি।
গানের পর গান। কখনও ‘আমার কাদা মাখা সার হলো’ কখনও ‘যাসনে ঘন বাঁকানদীর বাঁকে’। গোপালের মা গেয়ে যায়। তার দুচোখ ভরা জল।
সকলের অলক্ষ্যে গানের আসর থেকে আবছা অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ি। এবারে চরণ পালের বাস্তুভিটার ভেতরে। আমাকে দেখতে পেয়ে চরণ পালের বংশের তখনকার কর্তা শরৎ ফকির নেমে আসেন, ‘আসুন আসুন, আপনার খবর পেইছি। ভেতরে উঠে আসুন, দীনদয়ালের আসন দেখবেন।’
একটা পুরনো পঙ্খের কাজ করা দালান। তার মধ্যে প্রায়ান্ধকার প্রকোষ্ঠ। বাইরে অন্তত একশো পুরুষ আর নারী ভক্ত মানসিক করে হত্যে দিয়ে আভূমি প্রণত। প্রকোষ্ঠের ভেতরে টিম টিম করে জ্বলছে প্রদীপ। অনেকক্ষণ ঠাওর করে চোখে পড়ে একটা ত্রিশূল চিমটে পিঁড়ে আরও যেন কী সব।
‘দণ্ডবত করুন’ শরৎ ফকির কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, ‘আমাদের বংশের বাইরে কেউ কখনও দীনদয়ালকে দেখেনি। আপনি সেই সুযোগ পেলেন।’
আবেগের তাৎক্ষণিকতায় চোখ বুজে গেল। ভাবলাম আমার মতো জ্ঞানপাপী অভাজনদের প্রতি এত কৃপা। শরতের চোখ অবনত। হাত বন্ধ মুষ্ঠি। তাতে ফকিরি দণ্ড। যেন প্রত্যাদেশের মতো বললেন : আমার সঙ্গে আসুন। তার পেছনে পেছনে লণ্ঠনের আলোয় গিয়ে দাঁড়ালাম এজমালি বাড়ির বিরাট ছাদে। শূন্য খাঁ খাঁ ছাদ। বৈশাখী পূর্ণিমার আলোকিত রাত। শনশন হাওয়া বইছে। ফকির হাতে দিলেন পরমান্ন প্রসাদ। দীনদয়ালের নিশিভোগ। অমৃতের মতো লাগল।
ছাদের কার্নিশে বুক ঠেকিয়ে ফকির তাকালেন জোৎস্নাজড়িত জলাঙ্গী নদীর জলের দিকে। চোখের দৃষ্টি সুদূর। বলতে লাগলেন : অনেকদিন থেকে আপনার মতো একজনের জন্য অপেক্ষা করছি। লক্ষ্য করছি বেশ কিছুদিন ধরে আপনি এ গাঁয়ে ঘুরছেন। কখনও আমার কাছে আসেননি। রামপ্রসাদ, দ্বিজপদ মাস্টার, হাতেম মিঞা এদের কাছে ঘুরছেন। কী আছে ওদের কাছে? কুবিরের ক’খানা গান? কী হবে সে গান নিয়ে? গানের মর্ম কিছু বুঝবেন? এ কি রেডিওর লোকগীতি! কিসসু বুঝবেন না যতক্ষণ না সাহেবধনী ঘরের তত্ত্ব বোঝেন। আমার কাছে সেই তত্ত্ব, সেইসব মন্ত্রের খাতা আছে। চরণপালের বস্তু। আপনাকে সব দেব।
বৈশাখের মধ্যরাতে এমন একটা আচম্বিত প্রাপ্তি একেবারেই ভাবনার মধ্যে ছিল না, তাই বিহ্বলতায় খানিকক্ষণ কথা বেরুল না। বেশ খানিক পর শুধু বলতে পারলাম : আমাকে দিয়ে কী কাজ হবে আপনার?
: আমার কাজ নয়, দীনদয়ালের কাজ। এ বাড়ি ভেঙে পড়ছে। দীনদয়ালের ঘরের ছাদ পড়ো পড়ো। ভক্ত শিষ্যরা গরিব। আমার মন বলছে আপনাকে দিয়ে দীনদয়ালের প্রচার হবে। গভরমেন্ট হয়তো দীনদয়ালের ঘর নতুন করে বানিয়ে দিতে পারে।
: কিন্তু আপনাদের ধর্মমত তো গোপন। তার এত প্রচার কি ঠিক হবে?
: সে কথা আমি অনেক ভেবেছি। কিন্তু আমি আর সেবা পূজা সামাল দিতে পারছি না। প্রত্যেক বেস্পতিবারের ভোগরাগ, নিত্য পূজার খরচ, অন্ন মোচ্ছবের বিরাট ব্যাপার, আসুনে ফকিরদের সম্বৎসরের হুঁকো পাটি দেওয়া, এ কি আর সম্ভব হবে? তাই ভাবছি আপনি যখন এসে গেছেন, আসলে দীনদয়াল আপনাকে পাঠিয়েছেন, তখন তার কাজ তিনি করিয়ে নেবেন। চলুন, রাত হলো। কাল দুপুরে আপনাকে সব দেব।
বাকি রাতটা কাটল দারুণ উত্তেজনায়। দ্বিজপদ বাবুর বাইরের বারান্দায় শুয়ে ঘুম আর আসে না। কাউকে বলতেও পারছি না সামনের দিন আমি কী পেতে চলেছি। অবশেষে সকাল হলো। আস্তে আস্তে সকালটা গড়িয়েও পড়ল। মোচ্ছবের লোকজন দীনদয়ালের নাম করতে করতে যে যার বাড়িমুখো রওনা দিল। দুপুরে কথামতো হাজির হলাম শরৎ ফকিরের ভিটেয়। তিনি যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন। বললেন, এই মাত্র দীনদয়ালের ভোগ নিবেদন শেষ হলো। আজ তো বিষ্যুদবার। আজকেই দীনদয়ালের বার। দীন দয়ালের সব আসনে আজ ভোগরাগ নিবেদন। আমি না জিজ্ঞেস করে পারলাম না যে, ‘আসল ব্যাপারটা কী? আসুনে ফকির কথাটা যা আগের রাতে শুনেছিলাম, তার মানেই বা কী?’
শরৎ ফকির বলে চললেন : আমাদের এখানেই দীনদয়ালের মূল আসন। কিন্তু আমাদের ঘরে যারা দীক্ষা নিয়েছে তাদের মধ্যে যারা সিদ্ধ তাদের বাড়িতেও আসন পাতার হুকুম দেওয়া আছে। কয়েক পুরুষ ধরে রয়েছে সেসব আসন। তারা দীক্ষা দেওয়ারও অধিকারী। তাদের বলে আসুনে ফকির। চৈতী একাদশীতে অগ্রদ্বীপে আমাদের বারুণী মেলা হয়। ওইখানে চরণপাল বাকসিদ্ধ হয়েছিলেন। সেই থেকে প্রত্যেক বছর অগ্রদ্বীপে দীনদয়ালের আসন পাতা হয়। আমি যাই। হাজার হাজার ভক্ত শিষ্য আসে। তিন দিন আমাদের পুজো মালসা মোচ্ছব হয়। আসুনে ফকিররা এক একটা গাছতলায় আসন পাতে। মন্ত্রদীক্ষা হয়। সামনের চোতমাসে আসুন। আমার সঙ্গে থাকবেন গাছতলায় তে-রাত্তির। কত কী দেখবেন, জানবেন। যাকগে এবার ভেতরবাড়িতে আসুন। আপনাকে কতকগুলো সামগ্রী দেব। কিন্তু কাউকে বলবেন না। অন্তত আমার জীবিতকালে নয়। কী, কথা দিলেন তো?
নীরবে সম্মতি জানিয়ে তাকে অনুসরণ করি। বুকের মধ্যে টগবগে উত্তেজনা। বাড়ির একেবারে ভেতরের মহলে ছিল এক বিশাল সিন্দুক। বিরাট এক চাবি দিয়ে তা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে খুললেন ফকির। ভেতরে হাত ডুবিয়ে লাল সালুতে মোড়া কী সব বেরুল। তাতে মাথা ঠেকিয়ে খুলে ফেললেন সালুর আবরণ। বেরুল কতগুলো কালজীর্ণ পুঁথি আর খাতা। হলদে কাগজ। তাতে ভুসো কালির উজ্জ্বল হস্তাক্ষর। এইগুলোতে আমাদের ঘরের সব গুহ্য খবর আছে। আর এই নিন আসল পুঁথি।
থরথর উত্তেজনায় হাতে নিলাম একটা পুঁথি। আদ্যন্ত লালকালিতে লেখা সাহেবধনী ঘরের গুপ্ত মন্ত্র আর সাধনরীতি।
ফকির বললেন : এই হলো সাহেবধনী ঘরের সত্য মন্ত্র আর গুপ্ত নাম। একজন মুসলমান নারী উদাসীন এ মন্ত্র আর আমাদের ঘরের দীক্ষা দেন। এগুলো আচরণমূলক। এর সমস্ত শিক্ষা পুরো জানতেন চরণপাল। তার ছেলে ছিলেন তিলক। তিলকের ছেলে ফটিক। ফটিকের চার ছেলে রামভদ্র, বীরভদ্র, প্রাণভদ্র আর মনমোহন ভদ্র। সেই রামভদ্রের বড় ছেলে আমি। এসব খাতা পুঁথি শিক্ষা পাঁচ পুরুষ পেরিয়ে আমার হাতে পড়েছে। খুব গুপ্ত সাধনা আমাদের। মাটির কার্য, নালের কার্য, করোয়া সাধন। এসব আপনাকে আমি বুঝিয়ে দেব। কুবিরের গানে আমাদের ঘরের তত্ত্বই ব্যাখ্যা করা আছে। তার বাইরের অর্থ আর ভেতরের কথা আলাদা।
আমি চোখ বোলাতে লাগলাম অদ্ভুত ভাষায় লেখা সেসব মন্ত্রে। বিড় বিড় করে পড়তে লাগলাম : আল্লাতালা ব্রহ্মসাঁই তোমার নেহার ধ’রে/মাটির বস্তুকে পান করিলাম/কি মন্ত্র অনঙ্গ মঞ্জুরী হিঙ্গলবরন গা হরিতেল বরনে সাধি/শুক্রখাই/পলকে পলকে গুরু যেন তোমায় দেখতে পাই/গোঁসাই আলেকসাঁই তুমি থাকো সাক্ষী/যে বয়সে খাইলাম চারি বস্তু সেই বয়সে থাকি/দোহাই দীননাথ/৩ বার।
ফকির বললেন : কুবিরের গানে এই কথাটাই আছে অন্যভাবে। চরণ পালের শিক্ষায় তিনি লিখেছেন : শনি শুককুল বীজ রূপে এক/আর আতসখাক বাদ চারে এক চারের মধ্যে এক। বুঝে দেখো সৃষ্টির বিষয়/আল্লা আত্মারূপে সব শরীরে বিরাজে সর্বময়।
এখানে ‘শনি শুককুল’ মানে বুঝলেন? শনি মানে শোনিত। এইবারে আমাদের ঘরের সত্যমন্ত্র শুনুন : ক্লিং শ্লীং দীনদয়াল সাহেবধনী সহায়। গুরু সত্য। চারিযুগ সত্য। চন্দ্রসূর্য সত্য। খাকি সত্য। দীননাথ সত্য। দীনদয়াল সত্য। দীনবন্ধু সত্য।
আরেক মন্ত্র শুনুন : ক্লিং সাহেবধনী আল্লাধনী দীনদয়াল নাম সত্য। চারিযুগ সত্য। কাম সত্য। করণ সত্য। ঠাকুর সত্য। দীনদয়াল সত্য। দীননাথ সত্য। দীনবন্ধু সত্য। গোঁসাই দরদী সাঁই। তোমারই আর আমার কেহ নাই॥ (লেখাটি বাংলামাটি পত্রিকা থেকে সংগৃহিত)