৬ মার্চ, ২০১১

ড. ইউনুসকে নিয়ে সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফের একটি বিশ্লেষন মূলক লেখা

দুর্ধর্ষ ক্ষুদ্রঋণ, দুর্বল ইউনূস, সবল টেলিনর এবং পরাশক্তির দুই খুঁটির ঠোকাঠুকি-কানাই      তুমি কোন খেল খেলছ এবার ?

ইউনুস সাহেবের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনাটাই ভুল জায়গায় চলছে। আলোচনাটা কেবল ড. ইউনুস কেন্দ্রিক হচ্ছে, চাপা পড়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্রঋণের প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে মিডিয়ায় বিরোধী ও পক্ষপাতীদের মধ্যে সমঝোতা আছে। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ ছাড়া এ আলোচনার কী মানে? টম হেইনম্যানের তথ্যচিত্রের প্রধান বিষয়ও ছিল ক্ষুদ্রঋণ। মনে রাখা দরকার নরওয়ে সরকারের টাকাতেই নরওয়ের টেলিভিশনের জন্যই টম হেইনম্যান কাজ করেছেন। এবং টেলিনরও নরওয়ের কোম্পানি। এই কোম্পানিটি চায় বাংলাদেশি শেয়ার গ্রামীন ফোনে না থাকুক, বাংলাদেশের মোবাইল ব্যবসার শিরোপা তাদেরই থাকুক। এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতীয় এয়ারটেল। এদের যোগাযোগে ইউনূসকে ধসানোর জন্য সাত বিলিয়ন ডলারের গুজবও বাজারে বেশ চাঙ্গা। নরওয়ে বা ডেনমার্ক আমাদের দেশে পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যেসব ধ্বংসাত্মক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, সেসব সর্বনাশের ওপর কোনো তথ্যচিত্র তাদের থেকে আশা করা যায় না। এসব দিক ভুলে থাকা রাজনৈতিকভাবে ভুল হবে।

ইউনুস সাহেব দুনীতি করেছেন কিনা সেটা বিতর্কে নিষ্পন্ন হবে না। নোরাড, সরকার আর মিডিয়া যদি আজ একবাক্যে প্রমাণ করে তিনি অস্বচ্ছতা করেননি, তাহলেই কার কী বলার থাকে? এবং সেটা করা হলেই তাঁকে আবার মুকুট পরিয়ে গ্রহণ করা হবে? আর তার অনিয়মটাও এমন গুরুতর কিছু না। তাহলেও এর উসিলায় তাকে একহাত দেখে নেওয়া হচ্ছে। তা হোক, কিন্তু তলার খেলাটা আসলে কী, যা জনগণের চোখের আড়ালে রাখা হচ্ছে? গুরুতর হলো ক্ষুদ্রঋণের নিষ্পেষণ। এ মুহূর্তে পঞ্চাশ কোটি মানুষ ক্ষুদ্রঋণের আওতায় আছে। তাদের জায়গা থেকে আলোচনাটা ক্ষুদ্রঋণের সুদবিষয়ক। ইউনুস এর মামুলি দুর্নীতি নিয়ে নয়।

দ্বিতীয়ত, ইউনুসের পরেও যা থাকবে তা হলো ক্ষুদ্রঋণ_‌'অজেয় ও দুর্ধর্ষ'। মার্কস যে উদ্বৃত্ত শোষণের কথা বলেছেন,  ইউনুস সাহেব সেটার নতুন দিগন্ত আবিষ্কার করেছেন। চাকরি, কর্মস্থল কোনো কিছুর দায়িত্ব না নিয়েই কেবল টাকা খাটিয়ে টাকা বানানোর পথ দেখিয়েছেন। বাজারের বাইরে বিরাজ করা নারীদের শ্রমকে তিনি শোষণের জালে এনেছেন, কিন্তু এর জন্য তাদের কর্মসংস্থান করার দায়িত্ব নিতে হয়নি। পুঁজিবাদ ভৌগোলিক বিস্তার শেষ করে এনেছে প্রায়, এখন তার ভেতরের দিকে শোষণ তীব্র করা দরকার। ক্ষুদ্রঋণ তত্ত্ব এই কাজটাই অভিনব চাতুর্যের সঙ্গে করে দিচ্ছে। এই শোষণের পন্থা আবিষ্কারের জন্যই তার নোবেল প্রাপ্তি। কেবল ক্ষুদ্রঋণই নয়, শোষণের নতুন মযদান হিসেবে তিনি সামাজিক ব্যবসা আবিষ্কার করেছেন। সুদি কারবার করে তিনি জাতি উদ্ধার করছেন এমন দাবি হাস্যকর। এত এত অর্থনীতিবিদ, তাদের কেউ কি একটু অঙ্ক কষে বা খোঁজখবর করে বলতে পারেন, এর মাধ্যমে কতজন গরিবের দারিদ্র্যমুক্তি হয়েছে? এটা চ্যালেঞ্জ, এবং এই চ্যালেঞ্জ কেউ নেবে না। এবং এ জন্যই ুদ্রণের বোঝা লাঘব করার আলোচনাকে দাবিয়ে রাখা হয়। এসব বিষয়ে মিডিয়ার ইউনূস বিরোধী ও পন্থীদের মন্তব্য কী?

এ বিষয়ে গত এক দশকে তাদের ুদ্রঋণের জয়ঢক্কা বাজাতে দেখা গেছে। গ্রামীণ, প্রশিকা, ব্র্যাকসহ এদের বিষয়ে তারা কী মনে করে? এরা কি ুদ্রঋণের কারবার করে না? বছর আগে সাপ্তাহিক ২০০০ ুদ্রঋণের ওপর
আনু মুহাম্মদের লেখাকে প্রচ্ছদ রচনা করেছিল। সেই অপরাধে যখন এর সম্পাদককে মা চাইতে হয়েছিল, তখন কারা কারা প্রতিবাদ করেছিলেন? বা, বদরুদ্দীন উমর, আনু মুহাম্মদসহ একদল লেখক-গবেষক যে গত ২০ বছর ধরে এর স্বরূপ উন্মোচন করে যাচ্ছিলেন, তখন কারা কারা চোখ বুজে ছিলেন? কিংবা এবারের বইমেলায় ুদ্রঋণের ওপর বদরুদ্দীন উমরের একটি বই প্রকাশ করার জন্য শ্রাবণ প্রকাশনীকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল, সংহতি প্রকাশনী আনু মুহাম্মদের ুদ্রঋণ বিষয়ক পুস্তক প্রকাশের দায়ে মেলার মূল অঙ্গনে স্টলই পায়নি। এসব ঘটনায় তো ইউনূস বিরোধীদের সোচ্চার হতে দেখা যায়নি।

তাহলে ক্ষুদ্রঋণের ড. ইউনুসে যদি সমস্যা না থাকে, তাহলে কোন ইউনুসে সমস্যা? টেলিনরের ইউনুসে? টেলিনরকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ব্যবহৃত হওয়া ইউনুসের আরেকটি অপরাধ, কিন্তু এ মুহূর্তে তিনিই টেলিনরের মধ্যে বঙ্গীয় পুঁজির অংশ। বড় পুঁজি ছোটো পুঁজি খাবে, ইউনূসকে খাবে টেলিনর। হাসিনার স্টান্টবাজিতে মুগ্ধ না হয়ে এই সমীকরণটি মনে রাখা দরকার।

গ্রামীণ একটি প্রতিষ্ঠান, এত বড় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ করাও বিরাট ব্যাপার। মানুষের ঋণও প্রয়োজন। এর সুদের হার অর্ধেকের নীচে নামালেও প্রতিষ্ঠানটি লোকসান করবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির সমস্যার জন্য ব্যাংকটাকে আমরা উঠিয়ে দিতে বলি না। এর বেলায় তাহলে কেন তা করা হবে? সরকার তাকে অব্যাহতি দিয়েছে, কিন্তু ক্ষুদ্রঋণের নিষ্পেষণ থেকে গরিবদের অব্যাহতি দেবে কে? দরকার গ্রামীণের পুনর্গঠন, এর লভ্যাংশ সত্যিসত্যি এর সদস্যদের মধ্যে বণ্টন। হিসেবের শুভংকরী ফঁাকিতে ভুললে চলবে না।

যারা তাই ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রামীণকে বাঁচিয়ে ইউনুসকে আঘাত করতে চাইছেন বা তাদের এই বিরোধিতার মধ্যে সমস্যা আছে। যারা চায় বাংলাদেশের নিজস্ব বৃহত প্রতিষ্ঠান না থাকুক, তারা এটা চাইতে পারে। ইউনূসের সঙ্গে হাসিনার সমস্যাটা রাজনৈতিক। ইউনূস যে ভূমিকা জরুরি অবস্থার সময়ে পালন করেছিলেন, সেই ভূমিকা আরো কার্যকরীভাবে পালনের জন্য তাকে জীইয়ে রাখতে চায় মার্কিন লবি। ফ্রেন্ডস অব গ্রামীণের নামে তারা সেটাই করছে। এদিক থেকে হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কাবু করার চেষ্টা করছেন। এই আকাঙ্খার সঙ্গে টেলিনরের সঙ্গে ইউনূসের দ্বন্দ্ব, বৃহত প্রতিষ্ঠান না রাখার আগ্রহীদের আকাংখার এই ত্রিমূখী সমীকরণের তীরেই আজ ইঊনূস বিদ্ধ হচ্ছেন। কিন্তু আমরা যারা এই তিন গ্রুপে পড়ি না, তাদের কী কর্তব্য? আমরা কি হাসিনার নামে জয়ধ্বনি দেব? নাকি আরেকটু ক্রিটিকালি দেখব?

হাসিনা কেবল অতীতের ভূমিকার জন্য ইউনূসের বিরুদ্ধে নামেননি, ুদ্রঋণের বিরোধিতার তো প্রশ্নই ওঠে না। হয়তো ভবিষ্যতের চক্রান্ত ঠেকাতে চাইছেন। তার মানে সামনে কি কোনো অশনি সংকেত আসছে? আবার ওলট-পালট হতে যাচ্ছে? স্পষ্টতই এই সরকার ভারত-মার্কিনের মদদপুষ্ট এবং তাদেরই সেবায়েত। আবার ইঊনূসেরও পৃষ্ঠপোষক তারা। এরকম সরকারের ইঊনূস বিরোধী হওয়ার অর্থ হচ্ছে, অস্তিত্ব সংকট থেকেই তারা এটা করছে। এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদের দুই দেশীয় খুঁটির দ্বন্দ্ব এটা। এবং এই দুই খুঁটির মধ্যে কোনো বিষয়েই কোনো দ্বিমত নাই। ইউনূস হাসিনারও আগে থেকে ভারতকে ট্রানজিট দান, চট্টগ্রাম বন্দর আমেরিকাকে দেওয়া, ফুলবাড়ীতে কয়লা খনি করা, দেশের উৎপাদনী কাঠামো দূর্বল করে বহুজাতিক পুঁজির জন্য অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার যেসব জাতীয় স্বার্থ বিরোধী প্রস্তাব গত এক দশকে করেছিলেন, তার সবাই বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করছে। তাহলে দ্বন্দ্বটা কোথায়? ক্ষমতার রাশ হাতে রাখা এবং আরো দ্রুতগতিতে সাম্রাজ্যবাদের চাহিদা পূরণ করা নিয়ে কি? অথবা অন্য কিছু, যা আমরা এখনো জানি না। কিন্তু এটা বলা যায়, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। ইউনূসের ক্ষতি করে সরকার যতটা মার্কিনের বিরোধিতা করলো, সেটা তাদের শোধ করতে হবে অন্য ক্ষেত্রে আমেরিকার আরো তাঁবেদারি করার মাধ্যমে।

এ অবস্থায়, কোনোপক্ষে না গিয়েও ক্ষুদ্রঋণের সুদ কমানো, একে সরকারি ঋণ ব্যবস্থার অঙ্গীভূত করা, জবাবদিহির মধ্যে আনার দাবি তোলাই কাজের কথা। হাসিনা বা ইউনূসকে সমর্থন না দিয়েও সেটা করা যায়। সেটা না করা মানে দুই গণবিরোধী শিবিরের অন্তর্দ্বন্দ্বের ক্রসফায়ারে পড়া, নিজে এবং জাতিশুদ্ধ।

একইসঙ্গে আরেকটা ১/১১ এর প্রস্তুতি নিয়েও সজাগ থাকা দরকার। আগেরটা যেমন ডেকে এনেছিল বিএনপি স্বয়ং এবং আখেরে লাভবান হয়েছিল আওয়ামী লীগ এবং সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট ত্রিশূল। এবারেও যদি সেরকম কিছু হয়, তাহলে লাভবান হবে বিএনপি-জামাত আর সাম্রাজ্যবাদের ওই ত্রিশূলের ফলা ও ডাণ্ডা আরো জবরদস্ত হবে। এই গল্পে জনস্বার্থের প্রতিনিধিদের কোনো ভূমিকা নেই। অস্তিত্বের স্বার্থে তাই তাবেদার সরকার আর বিএনপি-জামাত চক্র এবং সেনা-কর্পোরেট-সিভিল সোসাইটির এই খেলার বাইরে জনগণের ভবিষ্যত বাচাবার রাস্তা তৈরি করাই এ মুহূর্তের কাজ।

পরিশিষ্ঠ: ড. ইউনূস ও ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে যে দাবি তুলতে হবে

ইউনূস পরবর্তী গ্রামীণ ব্যাংক আর ক্ষুদ্রঋণের কী হবে? যেভাবে মহাজনী প্রথা বিনা ক্ষতিপূরণে বিলোপ করা হয়েছিল, সেভাবে ক্ষুদ্রঋণের সুদ, ব্যবস্থাপনা, আদায় পদ্ধিত দরিদ্রবান্ধব করতে হবে। কৃষক-প্রজা পার্টি যেভাবে ঋণ-সালিশী বোর্ড গঠন মহাজনদের নিষ্পেষেণের বিরুদ্ধে কৃষকের রক্ষাকবচ হয়েছিল তেমন সালিশ আদালত গঠন করতে হবে। গ্রামীণের জাতীয়করণ করতে হবে। এর ওপর আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নীকারী সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা আইএফসি, আইএমএফ ইত্যাদির সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। গ্রামীণের অবকাঠামো, লোকবল, অভিজ্ঞতাকে কৃষক নর-নারীর পক্ষে আনার কাজ চালাতে হবে। এধরনের সব প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ দিতে হবে। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তাদেরো অধিকার রাখতে হবে। তাদের শোষণের হাতিয়ার হিসেব ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, ইউনূস বাচানো তাদের কাজ নয়। এইসব কিছু করতে গিয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস না হয়, বরং এর গণবিরোধী ভুমিকার অবসানই হওয়া উচিত সব কর্মকাণ্ড ও সমালোচনার লক্ষ্য। (সূত্র: ফেইসবুক)