৮ মার্চ, ২০১১

দেশের মানুষের সহযোগিতা চেয়ে আবেদন ড. ইউনূসের


আনোয়ারুল করিম, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
দেশের মানুষের সহযোগিতা চেয়ে আবেদন ড. ইউনূসের
ঢাকা: বয়স পেরিয়ে গেলেও গ্রামীণ ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বেশি সময় ধরে থাকার ঘটনা নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ইউনূস নিজ স্বাক্ষরিত একটি খোলা আবেদন সোমবার রাতে প্রকাশ করেন। পূর্ণ পৃষ্ঠায় ৩৮৮ শব্দের এ আবেদনে ইউনূস দেশবাসী কাছে আন্তরিক সহযোগিতা চেয়ে বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের মসৃণ ও আনন্দমুখর দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য আমি সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।’ড. ইউনূসের এ আবেদন গ্রামীণ ব্যাংকের তথ্য ও গণমাধ্যম সমন্বয় শাখার মহাব্যবস্থাপক জান্নাত-ই-কাওনাইন দ্বারা ইমেইলে প্রেরিত হয়। ইউনূস তার আবেদনে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রতিবছর পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা সত্ত্বেও ১২ বছর পর এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’তবে বাংলাদেশ ব্যাংক একবার যে আপত্তি জানিয়েছিল সে কথা ইউনূস তার চিঠিতে নিজেই জানান।  তিনি বলেন, ‘এরমধ্যে শুধুমাত্র একবারই ১৯৯৯ সালে বাৎসরিক পরিদর্শনের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক একবার আপত্তি তুলেছিল যার জবাবও গ্রামীণ ব্যাংক সন্তোষজনকভাবে দিয়েছিল। এরপর আর কোনদিন এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি তোলা হয়নি।’গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য খোলা আবেদনে ড. ইউনূস সোমবার আদালতে রিট পিটিশনের শুনানির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আজ (সোমবার) তৃতীয় দিনে উচ্চ আদালতে আমাদের রিট পিটিশনের শুনানি শেষ হলো। আমরা আশা করছি যে মহামান্য আদালত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করাটা অবৈধ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ জারী করাটা বৈধ কিনা তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখবে।’

ড. ইউনূস বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংকের ৯ জন ঋণগ্রহীতা পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক হিসেবে যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব করে যাচ্ছেন। যাদের মাধ্যমে প্রায় ৮৩ লাখ শেয়ার মালিকের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।’
গ্রামীণ ব্যাংক পরিবারের সদস্যদের চার কোটি মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতেও তিনি আবেদন জানান।
তিনি বলেন, ‘ব্যাংকে ৯ জন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য গত বৃহস্পতিবার আদালতের নিকট গ্রামীণ ব্যাংকের সকল সদস্য পরিবারের প্রায় চার কোটি মানুষের পরিপূর্ণ আস্থা নিয়ে মহামান্য আদালতের নিকট বিচার চেয়ে রিট আবেদনের জন্য দেশের দূর-দূরান্ত হতে ছুটে এসেছেন।’
বয়স বেড়ে ৭০ হলেও ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকার পক্ষে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের কথাই আবারও ইউনূস তার আবেদনে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিক্রমে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ আমাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব অর্পণ করেছিল এবং সর্বসম্মতিক্রমে এও নির্ধারণ করে দিয়েছিল যে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জন্য কোনো বয়সসীমা প্রযোজ্য হবে না।’

ড. ইউনূস বলেন, ‘আমি আমার জীবনের পুরো সময়টা কাটিয়েছি বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন  থেকে দারিদ্র্যের চিহ্নগুলো একে একে মুছে ফেলার ব্রত নিয়ে। আমার সব চিন্তা গ্রামীণ ব্যাংকের সকল সদস্য ও কর্মীর কল্যাণে নিয়োজিত।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের জীবনে, বিশেষ করে তরুণদের জীবনে, দ্রুত পরিবর্তন আনা নিয়ে আমি সব সময় স্বপ্ন দেখে এসেছি। দেশের ও দেশের মানুষের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক আমার এই প্রচেষ্টার উত্তরাধিকারিত্ব বহন করে যাবে।’
গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তিনি সরে গেলে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের প্রচেষ্টা যে তিনি করছেন তারও আবেদনে উল্লেখ করেন ড. ইউনূস।
তিনি বলেন, ‘একটি মসৃণ ও আনন্দময় পরিবেশে আমার হাত থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের হাতে দায়িত্ব তুলে দেবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমি এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রচেষ্টা চালাতেই থাকবো যতক্ষণ পর্যন্ত না এর জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা পাই।’
গ্রামীণ ব্যাংকের নারী কর্মীরা আগের মতোই কাজ করে যাবেন বলেও তিনি আশা করেন।
ড. ইউনূস বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে গ্রামীণ ব্যাংক নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে অবিচলভাবে কাজ করে যাবে- যেভাবে গত ৩৪ বছর ধরে করে এসেছে।’
৭০ বছর বয়সেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অব্যাহতি প্রদান এবং আদালতের দ্বারস্থ হওয়া ইস্যুতে দেশের সব মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এই বাংলাদেশি।
তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের সকল নাগরিকের আন্তরিক সহযোগিতা চাই। গ্রামীণ ব্যাংকের মসৃণ ও আনন্দমুখর দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য আমি সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।’
আবেদনের শেষ প্যারায় তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, একটি সুন্দর অবকাঠামোর আওতায় গ্রামীণ ব্যাংককে যেভাবে অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্বলিত বিশ্ববরেণ্য নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একটি ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেভাবে এই ব্যাংকে দরিদ্র নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন, আইনের প্রতি সকলে মিলে সম্মিলিতভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন এবং এর অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে অটুট মনোবল নিয়ে এগিয়ে আসবেন। সকলের প্রতি আমার এই আবেদন।’
বয়স পেরিয়ে যাওয়ায় ব্যাংক বিধিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার এক আদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ইউনূসকে অপসারণ করে। ওই আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে পরদিন সকালেই বিচারপতি মো. মমতাজউদ্দিন আহমেদ ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চে রিট আবেদন করেন তিনি।
সেদিন থেকে শুরু করে সোমবার পর্যন্ত তিন কার্যদিবস তার ওই আবেদনের ওপর শুনানি চলে। মঙ্গলবার বেলা দুইটায় এ বিষয়ে আদেশ দেওয়ার সময় নির্ধারণ করে আদালত।
আদালতের আদেশের ১৬ ঘণ্টা আগে এই আবেদন জানালেন ড. ইউনূস। (বাংলানিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম)