১ জানুয়ারি, ২০১১

2010 এর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলি

প্রত্যেকটি বছরই থাকে ঘটনাবহুল, প্রতিবারের মত ২০১০ সাল ছিলো বাংলাদেশে জন্য আরও ঘটনা বহুল। অনেক ঘটনার মধ্য থেকে কয়েকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলোঃ
খুনিদের ফাসি
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবছরই কার্যকর করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসির রায়। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয় ২৭ জানুয়ারি। ওই রাতে এক এক করে ফাঁসি দেওয়া হয় সাবেক সেনা কর্মকর্তা বজলুল হুদা, একে মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার), মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), সৈয়দ ফারুক রহমান ও সুলতান শাহরিয়ারকে।

যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতার
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর পর এই বছরের ২৫ মার্চ গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ ২৯ জুন গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ১৩ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয় আব্দুল কাদের মোল্লা, মোহাম্মদ  কামারুজ্জামানকে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও  ১৬ ডিসেম্বর  গ্রেপ্তার করা হয়।

খালেদার বাড়িছাড়া
আদালতের রায় অনুযায়ী ১৩ নভেম্বর খালেদা জিয়া তার ৪০ বছরের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি ছেড়ে আসেন। পরদিন বিএনপির ডাকে পালিত হয় হরতাল। তবে
বাড়ি ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে খালেদা জিয়া সাধারণ মানুষের যতো সহমর্মিতা পেয়েছিলেন, তার সবটুকুই বিফলে যায় ঈদের আগে দেওয়া হরতালে।


নীমতলি ট্রাজেডী
স্মরণকালের ভয়াবহতম অগ্নিকান্ডের ঘটনাটি ঘটে পুরান ঢাকার নিমতলীতে। গত ৩ জুন বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯ টার দিকে এই অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এই আগুনে প্রায় ৫০টি বাড়ি ও দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ভয়াবহ এই অগ্নিকান্ডে একই পরিবারের ৩৫ জন সহ ওই বিয়েবাড়িতে আসা প্রায় ৯০ জন মানুষ ঘটনাস্থলে মারা যায়। পরে গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত ওই ঘটনায় সর্বশেষ ১২৫ জন মানুষ প্রান হারায়, আহত হয় প্রায় দুইশতকেরও বেশি। বছরের ভয়াবহ এই অগ্নিকান্ডে সরকার জাতীয় শোক ঘোষণা করে। যেই বিয়ে বাড়ি থেকে এই আগুনের সুত্রপাত সেই বিয়ে বাড়ির দুই মেয়ে সহ আরেক মেয়েকে নিজের কণ্যা বলে ঘোষণা করে তাদের নিজে অভিভাবক হয়ে বঙ্গভবন থেকে তাদের বিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 সংবিধানের সংশোধনী
২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট সংবিধানের ৫ম সংশোধনী বাতিল করেন হাইকোর্ট। আর কিছু সংশোধনী এবং কিছু পর্যালোচনাসহ প্রায় ৫ বছর পর ২০১০ এর ২ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেন। এই রায়ের ফলে খন্দকার  মোশতাক, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম এবং জিয়াউর রহমানের শাসন অবৈধ হয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত শাসনকালের কিছু কাজকে হাইকোর্ট মার্জনা করেন রায়ে। এছাড়া সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার বিধান আবার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিতে ‘ধর্মনিরপেতা’ পুনর্স্থাপিত হয়। অপর দিকে, ২৬ আগস্ট সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। এই রায় অনুযায়ী ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদের জারি করা সামরিক শাসন, এরপর থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত জারি করা সব সামরিক আদেশ, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের আদেশ, সামরিক আইন আদেশ ও সামরিক আইন নির্দেশ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বা অন্য কোনো কর্তৃপরে আদেশ অবৈধ। ২৬ আগস্টের হাইকোর্টের রায়ের র্পুণাঙ্গ কপি বের হয় গত ২৯ ডিসেম্বর। পূর্ণাঙ্গ রায়ে মহাজোট সরকারের অংশীদার সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদের এরশাদের সামরিক ক্ষমতা গ্রহণকে ন্যক্কারজনক, জনবিরোধী এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করেন আদালত।

ড. ইউনুস ও নরওয়ে টেলিভিশন
২০১০ সালের শেষের দিকে ইউনুস প্রসঙ্গ উঠে আসে দেশের সকল পত্র পত্রিকায়। দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের একটি তহবিল থেকে প্রায় ৭শ কোটি টাকা বা ১০ কোটি ডলার সরিয়েছেন বলে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে অভিযোগ করা হয়। নরওয়ের ওই টেলিভিশনে প্রথমবারের মত প্রচারিত ‘ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদে’ নামে এই প্রামাণ্য চলচ্চত্রটি নির্মাণ করেছেন ডেনমার্কের চলচ্চিত্র নির্মাতা টম হাইনেমান। ১৯৯৬ সালে গ্রামীণব্যাংকের দরিদ্র ঋণ গ্রহীতাদের জন্য আসা এই অর্থসাহায্য তার মালিকানাধীন আরেকটি কোম্পানিতে স্থানান্তর করেন নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস। চলচ্চিত্রটিতে বলা হয়, ড. ইউনূস তার বিখ্যাত গ্রামীণব্যাংকের মাধ্যমে গ্রামের বহু দরিদ্র নারীকে ৩০ ভাগ সুদের হারে ঋণ দিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলেছেন। নির্মাতা অভিযোগ করেছেন, প্রায় ৬ মাস ধরে তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার এবং বিষয়টি সম্পর্কে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ড. ইউনূস তাকে কোনো সময় দেননি। ইউনুস বির্তকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ ডিসেম্বর তার কার্যালয়ে বলেন ‘গরীব মানুষের রক্ত চুষে বেশি দিন টেকা যায় না সেটাই প্রমাণিত হয়েছে’। নিজের আখের গোছাতে গিয়ে ফেঁসে গেছেন ড. ইউনূস।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশ থেকে গরিব মানুষ দেখিয়ে টাকা আনা হলেও গরিবের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ ঘটনার ভালোভাবে তদন্ত হওয়া উচিত এবং কোনোভাবেই দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হোক এটা সরকার চায় না।’ এরপর ১২ ডিসেম্বর ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক সাংবাদিক সম্মেলনে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।




জাহাজ ছিনতাই
গত ৫ ডিসেম্বর আরব সাগরে বাংলাদেশি একটি জাহাজ হাইজ্যাক হয়। এমভি জাহান মণি নামের জাহাজটিতে ২৫ জন বাংলাদেশি নাবিক এবং এক নাবিকের স্ত্রী রয়েছেন। জিম্মি দশার এখনও অবসান হয়নি। এরই মধ্যে জাহাজের কয়েকজন নাবিক লুকিয়ে তার স্বজনদের কাছে ফোন করে জানিয়েছেন, তাদের সবাইকে একটি রুমে আটকে রাখা হয়েছে। খেতে দিচ্ছে, তবে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। প্রায় প্রতিদিনই জাহাজে থাকা নাবিকদের স্বজনরা প্রধানমন্ত্রী, জাহাজটির মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন করছেন জাহাজে থাকা নাবিকদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে।

এছাড়াও ২০১০ সাল অর্জনের বছর হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়ঃ
১. মুসা ইব্রাহীম বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু এভারেস্ট শৃঙ্গে।
২. বাংলাদেশে  জন্ম নেওয়া এক বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছেন কৃত্রিম কিডনি।
৩. পাটের জেনোম বা জীবন রহস্য আবিষ্কার করে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি কুড়িয়েছেন বাংলাদেশি গবেষক।
৪.আর সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় নারী ও শিশুমৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনার সাফল্যে বাংলাদেশ পেয়েছে জাতিসংঘ পুরস্কার।
৫. ২০১০ এ এসেছে এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেট স্বর্ণপদক । সেই সঙ্গে মহিলা ক্রিকেটের রৌপ্যপদক।
৬. ১১ নভেম্বর দেশের ৪৫০১টি ইউনিয়ন পরিষদে একযোগে চালু করা হয় তথ্য সেবাকেন্দ্র।
৭. বছরের শেষ দিকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আইটি গবেষণানির্ভর প্রতিষ্ঠান ‘গার্টনার’ তাদের সর্বশেষ সমীক্ষা প্রকাশ করে। এই সমীক্ষায় বিশ্বের ৩০টি আইটিনির্ভর আউটসোর্সিং দেশের তালিকায় স্থান পায় বাংলাদেশ। যা দেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য এটি একটি বড় অর্জন।
৮. জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে একটি আলোচিত বিষয়। বছরের শেষ সময়ে নতুন শিক্ষানীতি জাতীয় সংসদে অনুমোদন পেয়েছে।
দেশের তথ্য এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে মহাকাশে উপগ্রহ স্থাপন করবে বাংলাদেশ। এর নাম হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। নতুন এ উপগ্রহ দেশের সম্প্রচারভিত্তিক প্রযুক্তিকে দ্রুতগতিসম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
৯. দীর্ঘদিন ধরেই জাহাজ তৈরি করছে বাংলাদেশ। তবে ২০১০ সালেই প্রথমবারের মত গভীর সমুদ্রে সব আবহাওয়ায় চলাচল উপযোগী জাহাজ তৈরি করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। (সূত্র: অনলাইন)