ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মহান বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রীতিধন্য বিনোদ বিহারী চৌধুরী শত বর্ষ পুরণ করলেন। আজ ১০ জানুয়ারি সোমবার ১০১ বছরে পা রাখলেন তিনি। আজ সোমবার তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দিচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কোলকাতাস্থ চট্টগ্রাম পরিষদ। এ উপলক্ষে সকাল ১১টায় দক্ষিণ কোলকাতার মধুসূদন মঞ্চে এ সংবর্ধনা দেয়া হবে। ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধের সংগ্রামী যোদ্ধা, স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী ও সাবেক আইন পরিষদের সদস্য বিনোদ বিহারী নিজ কর্মগুণে হয়ে উঠেছেন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। সিক্ত হচ্ছেন আপামর জনতার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। স্থান করে নিয়েছেন জাতির প্রেরণার অনবদ্য উৎস হিসেবে। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে আপামর জনগণের মুক্তির সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে তাঁকে কখনো কাটাতে হয়েছে অজ্ঞাতবাসে, কখনো বা গৃহবন্দি অবস্থায়, আবার কখনো কারাগারে। মাত্র ষোল বছর বয়সে ১৯২৭ সালে বিপ্লবী দল 'যুগান্তরে' যোগ দেয়ার পর বিনোদ বিহারী শহীদ মাস্টারদা সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার, রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও শহীদ মধুসূদন দত্তের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন। শুরু হয় তাঁর বিপ্লবী জীবন।
মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে ১৯৩০ সালের ১৮ থেকে ২০ এপ্রিল সংঘটিত ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহে অংশ নেন তিনি। বিদ্রোহের অংশ হিসেবে ১৮ এপ্রিল বিপ্লবী অনন্ত সিংহ ও গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম পুলিশ অস্ত্রাগার দখল করে বৃটিশ পতাকা নামিয়ে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় মাস্টারদা সূর্য সেনকে রাষ্ট্রপতি পদে বরণ করে অস্থায়ী গণতন্ত্রী বিপ্লবী সরকারের ঘোষণা দেন। ২২ এপ্রিল মাস্টারদা'র নেতৃত্বে ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধে বৃটিশ বহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়ে তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ১৯৩০ থেকে অজ্ঞাতবাসে থাকাবস্থায় বৃটিশ সরকার বিনোদ বিহারীকে গ্রেফতারের জন্য শুধু হুলিয়াই জারি করেনি, জীবিত বা মৃত ধরে দেয়ার জন্য তৎকালীন ৫শ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করে। ১৯৩০ থেকে অজ্ঞাতবাসে থাকাবস্থায় বৃটিশ সরকার ১৯৩৩ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। প্রায় ৫ বছর চট্টগ্রাম জেল, কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেল, দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্প ও বহরমপুর জেলে কাটিয়ে ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান। ১৯৩৯ সালে আবারো তাঁকে এক বছর গৃহবন্দি করে রাখা হয়। দু'বছর পর আবারো তাঁকে গ্রেফতার করে চট্টগ্রাম জেল, হিজলী বন্দি শিবির, খোকশা বন্দি শিবিরে আটক রাখা হয়। পাকিস্তান আমলেও স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বন্দিশালায় তাকে ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত এক বছর কারা বরণ করতে হয়। বৃটিশ ভারতের কারাগারে আটক থাকাবস্থায় তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুসারী হয়ে ওঠেন এবং ১৯৩৯ সালে কারাগার থেকে মুক্তির পর ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস নির্বাহী কমিটির সদস্য থাকাবস্থায় তিনি ১৯৪৬ সালে দলের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর অনেকের মতো স্বদেশত্যাগী না হয়ে সে বছরই পাকিস্তান জাতীয় কংগ্র্রেস প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৮ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ নির্বাচনে কংগ্রেস দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে আরো বিকশিত করার লক্ষে অসম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য কংগ্রেস নেতা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নেতৃত্বে পৃথক নির্বাচনের বিপরীতে যুক্ত আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে ১৯৭১-এ প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন করেন। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে বিকল্পে সামাজিক-মানবাধিকার আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে আসছেন। দৈনিক পাঞ্চজন্য পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে ১৯৩৯ সালে শ্রী চৌধুরী তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৪০ সালে আইনজীবী হিসেবে চট্টগ্রাম আদালতেও যোগ দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিকতাকে আজীবনের পেশা হিসেবে বেছে নেন। দেশপ্রিয় ব্যারিস্টার যতীন্দ্র মোহন সেন গুপ্তের সহধর্মিনী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এককালীন সভানেত্রী শ্রীমতী নেলী সেন গুপ্তার মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তার একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ দেশ-বিদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সম্মানিত হয়েছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে মহান ভূমিকার জন্য তাঁকে বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সন্মাননা স্বাধীনতা পদক-এ ভূষিত করে।জন্মদিনের অনুভূতি জানাতে গিয়ে স্বাধীনতার সাড়ে তিন দশক ধরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন বর্ষীয়ান এ বিপ্লবী। তাঁর ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের নবলব্ধ নীতিমালাকে সংবিধান থেকে বাতিলকরণে প্রায় সব রাজনীতিক দলের প্রত্য বা পরো সমর্থন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সততা, মৌলিক দলীয় উদ্দেশ্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ সুদীর্ঘ সময়ে সংখ্যালঘুর উপর নির্যাতন-নিপীড়ন-বঞ্চনা-বৈষম্যের কমতি ঘটেনি। রাজনীতিতে জনগণ পরিণত হয়েছে গিনিপিগে। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদিতা, জঙ্গিবাদের পথে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে একটি মহল সচেষ্ট রয়েছে।
তিনি বলেন, ত্রিশের দশকে আমরা কয়েকজন যুবক যেভাবে মরে মরে পুরো ভারতকে জাগাতে চেয়েছিলাম, তেমনিভাবে পৃথিবীতে যতদিন বাঁচবো ততদিনই থাকবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলধারায় সমাজপ্রতিষ্ঠায় বোধহীন এ সমাজকে জাগাবার প্রচেষ্টা। যুব সমাজের কাছে তার আহ্বান_ সাহস অবলম্বন কর, দুর্বলতা ও কাপুরুষতা, পাপ ছেড়ে সবাইকে হতে হবে চরিত্রবান। জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে বেশকিছু জাতীয় দৈনিক তাঁকে সম্মাননা দেয়। সংবর্ধনা জানায় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এসব সম্মাননা-সংবর্ধনা থেকে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি তার রাজনৈতিক গুরু মাস্টারদা সূর্য সেনের স্মরণে স্মারক-বক্তৃতা আয়োজনের জন্য ২০০০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে হাতে তুলে দেন। বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে। সর্বত্রই তিনি তুলে ধরেছেন মাতৃভূমির গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির কথা। এখনও নেই তার এক বিন্দু অবসর। বিভিন্ন সংগঠনের সাথে রয়েছে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। তিনি গান শুনতে পছন্দ করেন আর ভালোবাসেন মানবপ্রেমের মহামন্ত্রে সবাইকে জাগাতে। প্রবীণ এই বিপ্লবী চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা স্বর্গীয় কামিনী কুমার চৌধুরী প্রখ্যাত আইনজীবী ছিলেন। তাঁর শিাস্থল ছিলো চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার রাঙ্গামাটি বোর্ড স্কুল, করোনেশন উচ্চ বিদ্যালয়, বোয়ালখালীর পি.সি. সেন সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি ১৯২৯ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীায় উত্তীর্ণ হয়ে রায়বাহাদুর বৃত্তি লাভ করেন। তৎকালীন বৃটিশ রাজ্যের রাজপুতনার দেউলি ডিটেনশেন ক্যাম্পে বন্দি থাকাবস্থায় ১৯৩৪ ও ১৯৩৬ সালে যথাক্রমে প্রথম বিভাগে ও ডিস্টিংশন নিয়ে তিনি আইএ ও বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তীতে বিএল ডিগ্রি লাভ করেন।(সূত্র অনলাইন)
