১ নভেম্বর, ২০১০

ঢাবিতে বছরব্যাপী অনুষ্ঠান শুরু রবি ঠাকুরের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে


১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলনেও বাঙালী বার বার নির্ভর করেছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ওপর। সারাবিশ্বের বাঙালীর চেতনায় মিলেমিশে আছেন তিনি এবং তার গান গায়নে-শ্রবণে। কবিতা, কথাশিল্প, নাটক, অনুবাদ, চিত্রকলা, সঙ্গীত, সুর সবক্ষেত্রেই তার চিহ্ন প্রবল প্রতাপে লেগে আছে বাঙালীর জীবন, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে। আর তার এই সৃষ্টিশীলতার অনেকটাই রচিত হয়েছে এই পূর্ব বাংলায়। বলা যায় তার সৃষ্টি জগতের স্বর্ণযুগ কেটেছে বাংলার পূর্বাচলে, বিশেষত উত্তরাঞ্চলে। তাই তার সৃষ্টিশীলতার বিরাট অংশের ভাগীদার বাংলাদেশও। এ কারণেই কবির সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী পালনে বাংলাদেশেও চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। তারই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগ আয়োজন করেছে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের। রবিবার শুরু হলো সেই অনুষ্ঠানই। পূর্ব বাংলার জমিদারি দেখাশোনার পাশাপাশি এখানে তার অবারিত সৃষ্টিধারাকে ফোকাস করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চার ধাপে আয়োজন করেছে এই অনুষ্ঠানের। 'পূর্বাচলের পানে তাকাই' শিরোনামে তারই প্রথম ধাপের উদ্বোধন করলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। আর এরই মাধ্যমে শুরম্ন হলো বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের। এতে আরও বক্তৃতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। 'পূর্বাচলের পানে তাকাই' শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন অধ্যাপক ড. মৃদুলকানত্মি চক্রবর্তী।
সভাপতিত্ব করেন সঙ্গীত বিভাগের চেয়ারম্যান কুহেলী ইসলাম। স্বাগত ভাষণ দেন উৎসব আহ্বায়ক শাহনাজ নাসরীন ইলা।
প্রবন্ধে মৃদুলকানত্মি চক্রবর্তী বলেন, জমিদারির কর্মভার গ্রহণ করে কবিকে বার বার আসা-যাওয়া করতে হয়েছে শিলাইদহ, শাহজাদপুর, দৰিণ ডিহি ও পতিসরে। এর ফলে বাংলার নিসর্গচিত্র, সমাজজীবন, মাটির কাছাকাছি যাদের বাস এবং নদীর পালিত জীবনের আহ্বান ও আতিথ্যে বিমুগ্ধ কবির অনত্মর্লোকেও যুগিয়েছে সৃষ্টির প্রেরণা। তারই আনত্মরিক প্রকাশ বিধৃত হয়েছে সেই সময়ে রচিত নানা কবিতায়, গানে, নাটকে, ছোটগল্পে, উপন্যাসে আর ছিন্নপত্রাবলীর ছত্রে ছত্রে। আর এই পূর্ব বাংলার সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে এক পত্রে কবি তার কন্যা মীরা দেবীকে বলেন_ 'শিলাইদহের মতো এমন মনের মতো জায়গা তো আর কোথাও দেখলুম না। আকাশে আলোতে হাওয়াতে পাখির গানে ফুলের গন্ধে আমার চারিদিকে এবং আমার মগজের ভিতরটা পর্যনত্ম ভরে গিয়েছে। এত শানত্মি এত সৌন্দর্য আর কোথাও নেই।'
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, পূর্ববঙ্গের সঙ্গে কবির যে পরিচয়, তা তার সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি ও পদ্মা নদীর সঙ্গেই ছিল কবির যত গভীরতা ও ভাব। যার প্রমাণ পাওয়া যায় কবির গান ও ছিন্নপত্রেই। কারণ কলকাতার প্রকৃতি কবিকে পারেনি কাছে টানতে। কবি জমিদারি দেখাশোনা করতে এসে প্রজাদের সুখ-দুঃখে এতটাই নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন যে_ তাদের উন্নয়নের জন্য তিনি সমবায়ের কথা ভেবেছেন, কৃষি যন্ত্রের মাধ্যমে চাষের কথা ভেবেছেন এবং তাদের আর্থিক উন্নতির জন্য ৰুদ্র ঋণ দেয়ার জন্য কৃষি ব্যাংকও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার নোবেলের পুরো টাকাটাই তিনি কৃষি ব্যাংকে দিয়ে দিয়েছিলেন। এ সব কারণে তার পূর্ববঙ্গে বাস ছিল বেশ ফলপ্রসূ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সমবেত কণ্ঠে 'উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে...' গানটির সঙ্গে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন হয় অনুষ্ঠানের। তার পর সমবেত কণ্ঠে ঢাবির সঙ্গীত বিভাগের শিৰার্থীরা আরও গেয়ে শোনায়_ ভয় হতে তব অভয় মাঝে..., চিত্র পিপাসিত রে গীত সুধার তরে..., আমি চিনিগো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী..., খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচায়..., আমরা সবাই রাজা..., হারে রে রে রে রে আমায় ছেড়ে দেরে..., বিশ্ববীণা রবে... প্রভৃতি গান। এর পরই শুরম্ন হয় শিৰক-শিৰার্থীদে একক কণ্ঠের গান। প্রথমেই রাজিব পরিবেশন করেন 'বসনত্মে কি শুধু...' গানটি। এভাবেই একে একে মৃদুলা 'আমার মন মানে না...', শাহনাজ নাসরীন ইলা 'আমি কেবলি স্বপন করেছি বপন...', মেহফুজ 'আমারি পথ চাওয়াতেই...', শুভ্রা 'শুধু যাওয়া আসা...', আলমগীর 'তোমার গোপন কথাটি...', কানন 'ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে...' গানগুলো শুনিয়ে ভূয়সী প্রশংসা কুড়ান ও মুগ্ধ করেন উপস্থিত শ্রোতাদের ।