মারিও বার্গাস ইয়োসা: (হেসে) প্রথমে আমাকেই বলতে দাও। তুমি আমাকে চমত্কার দু’টি বই পাঠিয়েছ এ জন্য ধন্যবাদ। বই দু’টি আমাকে আলোড়িত করেছে।
অ্যাঙ্গুস মিশেল: ধন্যবাদ, বই দু’টি মনে হয় আপনার ভালোই কাজে লেগেছে।
ইয়োসা: হ্যাঁ, আমাজন জার্নালের রজার কেইসমেন্টকে নিয়ে প্রায় সব সংস্করণ আমি পড়েছি। তার মধ্যে এ দু’টি সত্যিই আমাকে উদ্দীপিত করেছে। চমত্কার, অসাধারণ দুটো বই।
মিশেল: আপনি কি স্যার রজার কেইসমেন্টের হার্ট অব ডার্কনেস-এর ফলোআপ নিয়ে কোনো বই লিখতে চান?
ইয়োসা: হ্যাঁ, সত্যি বইটির সব উপাদানই অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমি এ উপাদানগুলোকে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে বই লিখতে চাই।
মিশেল: আপনি কতদিন থেকে এ উপন্যাস লেখার কথা ভাবছেন?
ইয়োসা: যখন থেকে বইটি আমি পড়েছি, প্রায় দেড় বছর ধরে। তবে এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি বইটি উপভোগ করতে পেরেছি, এটাই বড় কথা। শুরুতেই আমি এটাকে উপলক্ষ করে বই লেখা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলাম। কিন্তু এখন প্রবল উত্সাহ নিয়ে লেখা শুরু করেছি।
মিশেল: প্রথম কবে আপনি কেইসমেন্টের মুখোমুখি হয়েছিলেন?
ইয়োসা: আমি জোসেফ কনরাডের ভক্ত। কনরাডের জীবনী পড়ার সময় রজার কেইসমেন্টকে আবিষ্কার করি। আমার কাছে মনে হয় কেইসমেন্টের অভিজ্ঞতা ছাড়া কনরাড ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ লিখতে পারতেন না। এরপর থেকেই কেইসমেন্টের প্রতি আমার দুর্বলতা বাড়তে থাকে। আমি তাকে নিয়ে গবেষণা শুরু করি। এরপরই আমি জানতে পারি কেইসমেন্ট বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতিতদের অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ কাজ করতে করতে তার বিয়োগান্তক সমাপ্তি ঘটে। রজার কেইসমেন্টের পরিণতি আমার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। অনেক পরে জানতে পারি, আমি অচেতনে রজার কেইসমেন্টকে নিয়ে লেখা শুরু করেছি।
মিশেল: আমি প্রচণ্ড অবাক হয়েছিলাম যখন ১৯৮০ Uchuraccay-তে সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনায় আপনাকে তদন্তের ভার দেয়া হয়েছিল। এ দায়িত্ব পালনে কেইসমেন্ট আপনাকে কীভাবে অনুরণিত করেছিলেন?
ইয়োসা: সম্ভবত এ ধরনের একই ঘটনা রজার কেইসমেন্টের অভিজ্ঞতাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। এ ঘটনা আমাকে জীবনের বহুমাত্রিকতার সম্মুখীন করেছিল। আমি জন্মভূমির আরেক রূপ দেখেছিলাম। আমি মনে করি, এ ধরনের ঘটনা সবাইকে মনে করিয়ে দেয় আমরা কোন বিশ্বে বাস করছি। কেইসমেন্টের জীবনটা ছিল অনেক নাটকীয়, নয় কি?
মিশেল : কঙ্গো ভ্রমণ বিষয়ে লেখার প্রস্তুতি হিসেবে আপনি কঙ্গো ভ্রমণ করেছেন, সেখানে আপনি কোন কোন এলাকা ভ্রমণ করেছেন? সে সময় আপনার অনুভূতি কি ছিল? আপনি কেইসমেন্টের কঙ্গো উপস্থিতির কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন কিনা?
ইয়োসা: হ্যাঁ, কঙ্গো ভ্রমণ করাটা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ আমি এমন একটি স্থান খুঁজছিলাম যেখানে কেইসমেন্ট দীর্ঘদিন অবস্থান করেছিলেন। কঙ্গোর বোমা এবং মাতাদি শহরের খুব বেশি পরিবর্তন হয়ে যায়নি। বিশেষ করে, মাতাদি কেবলমাত্র আধুনিকতার ছোঁয়া পাচ্ছে। কিন্তু এখনো সেখানে ঔপনিবেশিকতার ছাপ স্পষ্ট বিদ্যমান। সেখানে গেলেই আপনি বুঝতে পারবেন কী পরিবেশে কেইসমেন্ট সেখানে দীর্ঘদিন বসবাস করেছিলেন। আমি খুুবই ভাগ্যবান যে সেখানে এমন এক মানুষের দেখা পেয়েছিলাম— যিনি নিজেদের অতীত নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন। তিনি আমাকে বোমার অতীত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।
মিশেল: সেখানকার জনগণের কেইসমেন্ট সম্বন্ধে ধারণা কী?
ইয়োসা: একটা বিষয় আমাকে খুবই হতাশ করেছে যে, দেশটির খুব কম সংখ্যক মানুষই কেইসমেন্টকে চেনে। যে মানুষটি তাদের জন্য, তাদের অধিকার আদায়ের জন্য এত বছর সংগ্রাম চালিয়ে গেছে, তাকে কীভাবে ভুলে যাওয়া সম্ভব। আরো বিস্ময়কর, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তার সম্বন্ধে খুব কম জানে। যেন ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে কেইসমেন্টের মৃত্যু ঘটানোর প্রক্রিয়া চলছে। মানুষের মনের গতিপ্রকৃতি এমন কেন— এ প্রশ্নটা আমি নিজেকে বারবার করেছি।
মিশেল: কেইসমেন্ট বলেছিলেন, আজ থেকে শত বছর পরেও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল একই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে…
ইয়োসা: হ্যাঁ ,যেমন কঙ্গোর কথাই ধরুন না। দেশটি এখনো আফ্রিকার অন্যতম অস্থিতিশীল এলাকা। আফ্রিকা এবং সারাবিশ্বে কঙ্গোর মতোই অনেক স্থানে অস্থিরতা বিরাজ করছে। কোনোটা আমরা জানি, কোনোটা জানি না।
মিশেল: অনেকে আপনার লেখাকে ইতিহাসনির্ভর নয়, কল্পনানির্ভর বলে সমালোচনা করেন- এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?
ইয়োসা: এটাকে আমি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখি— প্রথমে মনে রাখা দরকার, আমি একজন ঔপন্যাসিক। আমি উপন্যাস লিখতে ভালবাসি। তা লিখতে আমি কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে থাকি। আমি ইতিহাস ভালোবাসি। তাই ইতিহাসকে উপলক্ষ করে উপন্যাস লেখার চেষ্টা করি, ইতিহাস নয়।
মিশেল: আমি আপনার সঙ্গে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
ইয়োসা: এটি একটি আকর্ষণীয় ও বিশাল একটি বিষয়।
মিশেল: আপনি উপন্যাস লেখার সময় কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেবেন— ইতিহাস, নাকি আপনার কল্পনাশক্তি? একটি উপন্যাসে কোন বিষয় সবচে গুরুত্ব বহন করে?
ইয়োসা: আমি মনে করি আপনি যখন একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখবেন, তখন তাতে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময় এবং নির্দিষ্ট এলাকার মানবিক পরিস্থিতিগুলো নিয়ে কাজ করা ঠিক নয়। এ সময় মানুষের সার্বিক সমস্যা, আবেগ এবং অধিকারের বিষয়গুলো চিন্তা করা উচিত। কারণ পরিশেষে এটা একটা উপন্যাস। তলস্তয়ের একটি কথা আমার খুব মনে পড়ে— তিনি বলেছিলেন, আপনি যখন ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ পড়বেন তখন আপনাকে একজন রাশিয়ান কিংবা নেপোলিয়ানের সমকালীন ব্যক্তি হতে হবে না। বিষয়টি এমনিতেই আপনাকে আলোড়িত করবে। আমি তো আগেই বলেছি, ইতিহাসনির্ভর হলেও সর্বোপরি এটা একটা উপন্যাস।
মিশেল: আপনি কি মনে করেন— আপনি খুব দ্রুত উপন্যাস লিখতে পারেন?
ইয়োসা: আমি এ বিষয়ে সন্দিহান। আমি যদি কেইসমেন্ট না পড়তাম, তবে এসব উপন্যাস লেখা আমার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াতো। আমি যখন কোনো কিছু পড়ি, তখন লেখার জন্য আমার পাশে কলম থাকে।
মিশেল: কেইসমেন্টের প্রসঙ্গে আবার আসি। অনেক বিখ্যাত লেখক কেইসমেন্ট জীবনকে স্পর্শ করেছেন কিংবা করার চেষ্টা করেছেন, যেমন জর্জ বার্নার্ড শ, জোসেফ কনরাড, জেমস জয়েস, ডব্লিউ বি ইয়েটস, আর্থার কোনান ডয়েল…
ইয়োসা: আমার মতে কেইসমেন্ট শুধু একজন বিপ্লবী নন— তিনি আইরিশ সাহিত্যের সম্পদ। তাকে নিয়েই লেখা হয়েছে বিখ্যাত বিখ্যাত সব লেখা। আইরিশরা সত্যিই ভাগ্যবান।
মিশেল: কোন ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক আপনাকে মুগ্ধ করে?
ইয়োসা: তলস্তয় ও ১৯ শতকের ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগো। বিশেষ করে অ্যান্ড্রু ম্যালরাক্সের ‘লা কন্ডিমন হিউম্যান’। এটি তার জীবনের অন্যতম সেরা কাজের একটি, যদিও রাজনৈতিক কারণে জনগণ তাকে অবহেলা করেছে। তবে সব ঐতিহাসিক উপন্যাসের পেছনেই লেখককে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখা সত্যিই খুব কঠিন।
মিশেল: আমার মনে হয়, সামাজিক অনগ্রসরতা, নিষ্ঠুরতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচে বেশি লেখেন কেইসমেন্ট। এসব লেখা আপনাকে কীভাবে সাহায্য করে?
ইয়োসা: হ্যাঁ, এসব বিষয়ে লিখতে তার অভিজ্ঞতা আমার জন্য কাজে লেগেছে। তার জীবনের লক্ষ্যটাই অন্য রকম। তবে সবার মনে রাখতে হবে কেইসমেন্ট অতিমানবীয় কিছু নন। তিনি একজন মানুষ। তিনি অসাধারণ ছিলেন, তবে সুপারম্যান নন। তার এ রূপটি আমি আমার লেখাতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
মিশেল: আপনাকে ধন্যবাদ।
ইয়োসা: তোমাকেও।
