‘বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মহান অধিপতি আমি, দাদু তুমি না বলেছিলে আমাদের এই বাংলায় বেনিয়া ইংরেজদের স্থান নেই। অথচ তোমারই অনুগ্রহে বড় হওয়া জগৎশেঠ রায়দুর্লভ, উর্মিচাঁদ আর মির্জাফররা বেনিয়া ইংরেজদের সাথে বাংলা দখল করার ষড়যন্ত্র করছে’ ইতিহাসের এমন কঠিন সংলাপ শুধুমাত্র একজনের কণ্ঠেই যেন মানায়। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রাঙ্গনের মুকুটহীন সম্রাট আনোয়ার হোসেন। আনোয়ার হোসেন এখন বয়সের ভারে নুজ্য। বলেছেন তার অতীত স্মৃতীর অনেক কথা।
জন্ম ও শৈশব
আমার জন্ম ১৯৩১ সালে জামালপুর জেলার মুরুলিয়ায়। বাবা নজীর হোসেন ছিলেন সরকারী চাকুরিজীবি। আমার মা সাইদা খানম ছিলেন গৃহিনী। বাবার চাকরির সুবাদে অনেক জায়গায় যেতে হয়েছে। তাই পড়ালেখাও করেছি বিভিন্ন জায়গায়। আমরা সাত বোন তিন ভাই ছিলাম। আমি ছিলাম তৃতীয় নম্বর। ছোট বেলা ভাই বোনরা মিলে অনেক মজা করতাম। এখন কার বাচ্চাদের মতো আমাদের শৈশব ছিল না। তবু অল্প পেয়েও আমরা খুব আনন্দে থাকতাম।
ছাত্রজীবন ও যৌবন
আমার পড়ালেখা হয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রথমে আমি জামালপুর একটি প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হই। ছোট বেলা আমার বন্ধু ছিল সব মেয়েরা। আমি স্কুলে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে বেশি মিশতাম। তবে তাদের নাম আমার এই মূহূর্তে মনে পড়ছে না। জামালপুরের এই প্রাইমারীতে কিছুদিন পড়ালেখা করার পর ভর্তি হলাম গফর গাঁ একটি স্কুলে। এর পর ব্রাক্ষন বাড়িয়া তারপর আবার জামালপুর। আমি ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি। মেট্রিক পাশ করে আমি ঢাকা এসে কলেজে ভর্তি হই।
অভিনয়ের সূত্রপাত
স্কুলজীবনে আমি অনেক নাটকে অভিনয় করেছি। ঢাকা এসে কলেজে ভর্তি হলে আমি selection engineers দের সাথে construction কাজে যোগ দেই। এভাবেই আমার পড়ালেখা, রোজগার ও অভিনয় চলতে থাকে। সে সময়কার বিখ্যাত পরিচালক ছিলেন মহিউদ্দিন সাহেব। তিনি একটি ছবি বানাবেন বলে নতুন ছেলে খুজতে থাকেন। মহিউদ্দিন সাহেবেন দুজন এসিস্টেন্ট ছিলেন মো, আনিস ও কামাল হোসেন। মো. আনিস আমাকে নিয়ে গেলেন, এবং কামাল হোসেন অন্য একটি ছেলেকে নিয়ে গেলেন। পরিচালক আমাদের দুজনকে দেখলেন। তিনি আমাকেই পছন্দ করলেন। ক্যামেরা ম্যান সাধন চৌধুরিও পছন্দ করলেন। এবং বললেন, আমি যেন বিকালে একটি শেরওয়ানী নিয়ে স্টুডিওতে আসি। বাসায় গিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। পরে মনে হলো কয়েকদিন আগে আমার ছোট বোনের বিয়ে হয়েছে। দুলাভাইয়ের শেরওয়ানী ছিল। তাই নিয়ে হাজির হলাম পরিচালক মহিউদ্দিনের কাছে। এ ভাবেই শুরু হয় আমার চলচ্চিত্রে পথ চলা। ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে আমার বিপরীতে ছিলেন নায়িকা চিত্রা সিনহা। এ ছবির মাধ্যমে আমার চলচ্চিত্রে পরিচিতি হলেও শুরু হয়েছিল মুলত ‘সূর্যসন্তান’ দিয়ে। কারণ ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রের আগে সুর্টি শুরু হয় ‘সূর্যসন্তান’ ছবিটি। কিন্তু মুক্তি আগে পায় ‘তোমার আমার’ ছবিটি।
উল্লেখযোগ্য সিনেমা
নবাব সিরাজদৌলা, সুতরাং, বিষকন্যা, নাচঘর, গোধূলির প্রেম, জোয়ার এলো, আজান, রাজা সন্যাসী, এতটুকু আশা, পাগলা রাজা, শহীদ তিতুমির, জয়বাংলা, বিনে সূতার মালা, জীবন থেকে নেয়া, নীল আকাশের নীচে, দীপ নিভে নাই, চরিত্রহীন, পালংক, দুই দিগন্ত, উজান, এতটুকু আশা, পরশমনি, গাজী কালু, চম্পাবতী, অরুনোদয়ে অগ্নি সাক্ষীসহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করেছি। যার অনেকগুলোর নাম এখন আর আমার মনে নেই।
বিবাহ ও সংসার
এত বেশি কাজের চাপ ছিল যে প্রেম করার সময় পাইনি। তাই পারিবরিকভাবে আমাকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমার স্ত্রীর নাম নাসিমা খানম। তিনি একজন সফল গৃহিনী। আমার চার ছেলে, তাহের হোসেন, কামাল হোসেন, বশির হোসেন, সাজ্জাদ হোসেন। এরা সকলেই দেশের বাইরে থাকে। আমার একমাত্র মেয়ে বনানী থাকে। আমার সন্তানরা যখন ছোট ছিল তখন আমার সঙ্গে ওদের খুব একটা দেখা হতো না। আমি সেই ভোরে চলে যেতাম, ফিরতাম গভীর রাতে। ওরা ওদের মাকে জিজ্ঞেস করত মা, বাবা কোথায়? বাবা কি দেশের বাইরে গেছে? তখন শুধু কাজ আর কাজ ছিল আমার মাথায়। সংসার দেখার সময় ছিল না। এখন আফসোস হয় সন্তানদের জন্য।
ক্ষোভ বা অভিমান
অভিনয় করেছি অনেক। কিন্তু শেষ জীবনে এসে এখনো আমার মনে হয় ভাল অভিনয়টা এখনো করতে পারিনি। আমার মনে হয় আরো ভাল অভিনয় করতে পারতাম। শিল্পীরা যেন মানুষের মনের মধ্যে থেকে হারিয়ে না যায় সে জন্য সকলেরই উচিত কিছু একটা করা। অনেক দাপুটে অভিনেত্রী-অভিনেতারা শেষ জীবনে বড় অসহায় ভাবে জীবন কাটান। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা ও খোঁজ খবর যেন নেয়া হয়। তা না হলে শিল্পীর শিল্প স্বত্তা বিলিন হয়ে যাবে। (সূত্র: ইন্টারনেট)
