বিশ্বজুড়ে প্রবালেরা মারা যাচ্ছে আর তাই বিজ্ঞানী ও বিভিন্ন দেশের সরকার পৃথিবী থেকে প্রবাল উধাও হয়ে গেলে এর পরিনতি কি হতে পারে তাই ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। প্রবাল হচ্ছে সাগরের প্রধানতম খাদ্যের উৎস। পৃথিবীর অর্ধেক মাছই তাদের খাদ্যের জন্য ব্যাপক ভাবে প্রবালের উপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ, এমনকি শুধুমাত্র এশিয়ারই একশ কোটি মানুষ জীবন ও জীবিকা প্রবালের উপর নির্ভলশীল। যদি প্রবালগুলো সব নিঃশেষ হয়ে যায়, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ক্ষুধা, দারিদ্র ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অত্যাসন্ন। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্যা কনজারভেশন অফ নেচার এর কার্ল গুস্টাফ লুন্ডিন বলেন "বিভিন্ন দেশগুলো তখন তাদের অস্তিত্বের হুমকির মুখে পড়বে।"
নানা গবেষনায় দেখা যাচ্ছে প্রবালদের অস্তিত্ব বিশ্বজুড়ে হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। এর পেছনের মূল কারন হিসেবে রয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও উপকূল উন্নয়ন। এর সাথে রয়েছে মাছধরা নৌকাগুলোর সমুদ্রতলদেশের তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক ভাবে প্রবালের তৈরি জুয়েলারী ও সুভেনির তৈরির প্রবনতা।
পৃথিবীর শতকরা ১৯ ভাগ প্রবাল ইতিমধ্যেই উধাও হয়ে গেছে। এরমধ্যে ক্যারাবিয়ান অঞ্চলের প্রায় ৫০ ভাগ প্রবালই মারা গেছে। আরো ১৫ ভাগ প্রবাল আগামী ২০ বছরের মধ্যেই নিঃশেষ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল ওশিয়ানিক এন্ড এটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড কনশাস অব মেরিন স্পিশিস এর ডিরেক্টর ও ওল্ড ডোমিনিওন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কেন্ট কার্পেন্টার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন বিশ্বউষ্ণায়ন যদি অব্যহত ভাবে চলতেই থাকে তবে আগামী ১০০ বছরে সকল প্রবাল নিঃশেষ হয়ে যাবে।"প্রবাল নিঃশেষ হয়ে গেয়ে সমুদ্রের ইকোসিস্টেম সম্পুর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে" কার্পেন্টার বলেন "সমস্ত প্রানীর জীবনে জলপ্রপাতের মত তরঙ্গিত পতন নেমে আসবে।"
বিচিত্র রঙিন প্রবালগুলো মোটেই প্রানহীন পাথর নয় তারা জীবন্ত, তারা শক্ত ক্যালসিয়াম কার্বোনেট দিয়ে তৈরি। একবার তাদের মৃত্যু হলে তাদের পাথুরে দেহ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে মাছেরা মৃত প্রবাল হতে খাবার পেতে বঞ্চিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরন ও পানির এসিডিফিকেশন ঠেকাতে প্রবাল ঘেরা অঞ্চলকে মাছধরা ও ডাইভিং মুক্ত এলাকা ঘোষনা করা, উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন বন্ধ করা ও সেখানকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন প্রবালের এই মৃত্যর হার রোধ করতে বা অন্ততঃ পক্ষে কমাতে সাহায্য করবে।
ফ্লোরিডার ১৪০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে অনুরূপ "নো-টেইক" জোন ঘোষনা করা হয়েছে। কতগুলো গুচ্ছ প্রবালদ্বীপের সমন্বয়ে তৈরি ড্রাই টরটাগাস ন্যাশনাল পার্কে এভাবে সীমারেখা টেনে দেয়া হয়েছে।
তবে বহু মৎসজীবি এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে। এ ছাড়াও পরিবেশ রক্ষার বিভিন্ন পদক্ষেপ নানা ধারনের আভ্যান্তরিন ও আন্তর্জাতিক বিরোধীতার সম্মুখীন হয়। সম্প্রতি কনভেনশন অন দ্যা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেঞ্জারড স্পিশিস অব ওয়াইল্ড ফোনা এন্ড ফ্লোরা তে আমেরিকা ও সুইডেন কিছু কিছু প্রবালের প্রজাতির কেনাবেচা নিষিদ্ধকরনের প্রস্তাব পেশ করলে তা ভোটাভুটিতে নাকচ হয়ে যায়।
যদি প্রবাল সব নিঃশেষ হয়ে যায় তবে প্রবালের সবচাইতে সুলভ প্রজাতি গ্রুপার ও স্ন্যাপারও ইতিহাসে পরিনত হবে। অয়েস্টারস, ক্লামস সহ অন্যান্য নানা প্রজাতি যেগুলো বহু লোকের খাদ্য তারাও ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন সীফুড সহ সমুদ্রের বানিজ্যিক মৎস আহরন বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে অবর্ণনীয়। জাতিসংঘের মতে সামুদ্রিক মৎস আহরনের উপর পৃথিবীর কমপক্ষে ৩৮ মিলিয়ন লোক নির্ভরশীল, তার সাথে আরো ১৬২ মিলিয়ন মৎস শিল্পের সাথে জড়িত।
যদি প্রবাল নিঃশেষ হয়ে যায় তবে গোটা পৃথিবীকেই এর মাশুল দিতে হবে। কিছু কিছু প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রানীর উপর ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিগুলো নির্ভরশীল। ক্যান্সার, আর্থ্রাইটিস ও ভাইরাসের চিকিৎসায় এগুলো সম্ভাব্য ব্যবহার রয়েছে।
"প্রবাল ছাড়া বিশ্ব কল্পনা করা যায়না" এনওএএর প্রধান জেন লুবশেনকো বলেন "প্রবাল খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, ঔষধ ও জীবিকার জন্য লক্ষ লক্ষ লোক বিশ্বজুড়ে প্রবালের উপর নির্ভরশীল। তাদের অনুপম সৌন্দর্য ও বৈচিত্রতা সারা বিশ্বের এক অনন্য সম্পদ"