ব্রিটেন থেকে অর্ধশতাধিক নারী ইসলামিক স্টেটে যোগ দিতে সিরিয়ায় চলে
গেছে বলে ধারণা করা হয়। তাদের বেশিরভাগকেই রিক্রুট করা হয়েছে অনলাইনের
মাধ্যমে। এদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যাও নেহায়েতই কম নয়। বলা হয়, এই
নারীদের পরিণতি জিহাদিদের যৌনদাসী হিসেবে। তারপরেও নারীরা কেন আইএসে যোগ
দিতে যুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় চলে যাচ্ছে? এবিষয়ে ব্রিটেনে বাংলাদেশি পরিবারগুলো কতটা সচেতন- এসব কিছু ওঠে আসে বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকার একটি স্কুল-
বেথনাল গ্রিন একাডেমি। দিনটি ছিল ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য
দিনের মতো ক্লাস চলছিল– কিন্তু সেদিন তিনটি মেয়ে স্কুলে আসেনি।
পড়ে জানা গেল ওরা সিরিয়ার পথে। তুরস্কের সীমান্ত পার হয়ে যাচ্ছে
তথাকথিত ইসলামিক স্টেটে যোগ দিতে। তারা হচ্ছেন - শামীমা বেগম, আমিরা আবাসী
এবং খাদিজা সুলতানা। বয়স ১৫ থেকে ১৭।
তাদের পরিবারের সদস্যরা একদিন আগেও এবিষয়ে কিছুই বুঝতে পারেনি। আমিরার
হতচকিত বাবা বলেছেন, সবকিছুই খুব স্বাভাবিক ছিল। তার চলাফেরা থেকে কিছুই
বোঝা যায়নি।
‘ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় ও শুধু বললো বাবা, আমার একটু তাড়া আছে।
ও শুধু একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলো- বাবা আমি একটু দূরে আছি। জোহরের
নামাজ পরেই চলে আসবো। তোমরা চিন্তা করো না। কিন্তু ও আর ফেরেনি।’, বলেন
আমিরার বাবা।
এই শামীমা, খাদিজা আর আমিরার মতো ৫০ থেকে ৬০ জন নারী ব্রিটেনের গ্লাসগো
থেকে ব্রিস্টল, ব্রাইটন থেকে লন্ডন এরকম বিভিন্ন শহর থেকে পাড়ি দিয়েছে
যুদ্ধ কবলিত সিরিয়ায়। সরকারি হিসেবে তাদের সংখ্যা ৫৬।
সিরিয়া, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ
প্রতিষ্ঠাকারী আইএসে যোগ দিয়েছে ইউরোপ থেকে যাওয়া বহু তরুণ। শুধু ব্রিটেন
থেকেই গেছে পাঁচশোর মতো, যার ১০ শতাংশেরও বেশি নারী।
ইসলামী উগ্রপন্থা প্রতিরোধে ব্রিটেনের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান –
কুইলিয়াম ফাউন্ডেশন। তারই একজন গবেষক নিকিতা মালিক বলেছেন, অনেক সময়
নিয়ে প্রচুর গবেষণার পরেই তারা ইসলামিক স্টেটে যোগ দিতে সিরিয়ায় যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন থেকে যে মেয়েগুলো গিয়েছে,
তাদের একজন একশোটিরও বেশি জিহাদি ওয়েবসাইট ঘাটাঘাটি করেছে। গবেষণায় দেখা
গেছে, ব্রিটেনে এধরনের কিছু নারীর সাথে আই এসের যোগাযোগও আছে। তাদের সাথে
ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হয়। আলোচনা হয় সমাজে নারীর অবস্থা
নিয়ে।’
তিনি বলেন, এই মেয়েরা মনে করছে, আইএস তাদেরকে মর্যাদা দিচ্ছে, তারাও
জিহাদে সমান অংশ নিতে পারছে, তাদের কিছুটা ক্ষমতায়ন ঘটছে যা আগে কখনো ছিল
না।
‘তাদেরকে যে শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যেতে হবে তা নয়। আগামী প্রজন্মের
মুজাহিদিনকে শিক্ষিত করে তোলা এবং জিহাদিদের ভাল স্ত্রী হয়ে উঠাও তাদের
ধর্মীয় একটি দায়িত্ব বলে তারা মনে করে।’, বলেন নিকিতা মালিক।
অল্পবয়সী মেয়েদের পাশাপাশি মায়েরাও যাচ্ছেন। এক বছরের শিশু সন্তান
থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ পিতাকে নিয়েও চলে গেছেন অনেকে গেছেন স্বামী
সংসার ফেলেও। বলা হয়, এইসব নারীর পরিণতি: জিহাদি যোদ্ধাদের যৌনদাসী।
তারপরেও কেন যাচ্ছে তারা?
কুইলিয়াম ফাউন্ডেশনের নিকিতা মালিক মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে মেয়েরা
বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারাও কোনো একটা কাজে অংশ নিতে পারছে। পুরুষ
যোদ্ধাদের মতো তারাও মনে করে পশ্চিমা দেশগুলো ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই করছে
এবং ইসলামিক স্টেটের হয়ে যুদ্ধ করতে পারলে তারা ভাল মুসলিম হতে পারবে।
একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তারা রাখতে পারছে সমান ভূমিকা।
‘এছাড়াও আরো কিছু বিষয় আছে যেগুলো তাদেরকে ইসলামিক স্টেটের দিকে ঠেলে
দিচ্ছে। যেমন তারা হয়তো মনে করছে সমাজে বা কমিউনিটিতে তারা নিজেদেরকে
ঠিকমতো মানাতে পারছে না,’ বলেন তিনি।
গবেষকরা বলছেন, আইএসে বেশকিছু নারী যোদ্ধা আছে যাদের কাজ অনলাইনের
মাধ্যমে নতুন নতুন মেয়ে সংগ্রহ করা। টুইটারের মতো সামাজিক নেটওয়ার্কে এই
অভিযান চালায় তারা। ধারণা করা হয়, গ্লাসগো থেকে যাওয়া একটি মেয়ের সাথে
অনলাইনে পরিচয়ের পরেই বেথনাল গ্রিনের একটি মেয়ে সিরিয়ায় চলে গেছে।
গবেষকরা বলছেন, সিরিয়াতে যাওয়া হচ্ছে এই মেয়েদের কারো কাছে অ্যাডভেঞ্চার আবার কারো কাছে রোমান্টিক এক অভিজ্ঞতা।
তাদেরকে বলা হয় কিভাবে পুরোটা পথ পাড়ি দিতে হবে, পিতামাতাকে লুকিয়ে
কীভাবে অর্থ পরিশোধ করতে হবে, বিমানের টিকেট কীভাবে এবং কোন ট্রাভেল
এজেন্টের কাছ থেকে কাটতে হবে, যুক্তরাজ্যে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে-এসব।
‘তাদের বিয়ের কথাও আগাম বলে দেওয়া হয়। মেয়েরা ভালো করেই জানে তারা
যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছাবে তাদেরকে বিয়ে করা হবে। আগে থেকেই তাদেরকে ধারণা
দেওয়া হয় সে কাকে বিয়ে করবে, তার ওই স্বামী কেমন, ওখানে গেলে সে কাজ
করতে পারবে কিনা, একজন শিক্ষক হতে পারবে কিনা, ওখানে তার ভূমিকা কি হবে-
এসব বিষয়ে তাদেরকে একটা প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়,’ নিকিতা মালিক বলেন।
বেথনাল গ্রিনের তিনজন কিশোরীর দু’জনই বাংলাদেশি। লুটন শহর থেকে দশ
সদস্যের একটি পরিবারও বাংলাদেশে ছুটি কাটিয়ে ফেরার পথে ব্রিটেনে না এসে
চলে গেছে সিরিয়ায়। বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে এনিয়েও অনেক দুশ্চিন্তা।
উগ্রপন্থার ব্যাপারে বাংলাদেশিদেরকে সচেতন করতে লন্ডনে একটি বাংলা টিভি
চ্যানেলে অনুষ্ঠান করেন হেনা আহমেদ। স্থানীয় একটি কর্তৃপক্ষের সোশাল
ওয়ার্কার হিসেবেও কাজ করছেন তিনি।
হেনা আহমেদের আশঙ্কা, এক প্রজন্মের অভিভাবকরা এবিষয়ে মোটেও সচেতন নন। তিনি বলছেন, তারা হয়তো আইএস কী, এটাও জানেন না।
তিনি বলেন, খুব ক্ষুদ্র খুব অল্প কিছু পিতামাতা আছেন যারা নিজেরাই তাদের
ছেলেমেয়েকে আইএসের ভিডিও দেখান বলে জানা গেছে। কারণ তারা মনে করেন
পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামের সাথে অন্যায় করছে এবং সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই
করার জন্যে তারা তাদের সন্তানদেরকে আইএসের জন্যে প্রস্তুত করছেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশি নন এরকম একটি মেয়ে সিরিয়ায় যাওয়ার জন্যে
বিমানে উঠার পর তাকে নামিয়ে আনা হয়। তার পিতামাতার সাক্ষাৎকার নেওয়া
হয়। তখন দেখা গেছে মেয়েটি ইউটিউবে যেসব ভিডিও দেখেছে মা-বাবাই সেগুলো
তাকে দেখিয়েছেন। হেনা আহমেদ বলেন, বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে পিতামাতারা
তাদের সন্তানের ওপর নজর খুব একটা রাখেন না এবং সেই নজর রাখার ক্ষমতাও তাদের
নেই।
কারণ ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেটে কী করছে সেবিষয়ে বাবা মায়ের কোনো ধারণা নেই। ইন্টারনেট সম্পর্কে তাদের দক্ষতাও নেই বললেই চলে।
‘ছেলেমেয়েরা বেডরুমে সারা রাত ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকে। জানতে চাইলে
তারা বলে যে পড়াশোনা করছে। বাবা মায়েরাতো সেটাই চান। ফলে তাদের পক্ষে এটা
জানা সম্ভব না যে ছেলেমেয়েরা আসলে সেখানে কি করছে,’ বলেন হেনা আহমেদ।
তিনি বলেন, সমাজে মান সম্মানের কথা ভেবেও অনেকে তার সন্তানের জঙ্গি যোগাযোগের কথা লুকিয়ে রাখেন।
লন্ডনে এরকম একটি বাংলাদেশি পরিবারের মা বাবার সাথে কথা বলে দেখা গেলো
তারাও এবিষয়ে খুব উদ্বিগ্ন। আর সেকারণে সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর
তারা তাদের নজরদারি বাড়িয়েছে।
এই পরিবারটি তাদের নাম প্রকাশ করতে চায়নি।
মা বলেন, ‘যখনই শুনি কেউ সিরিয়ায় গেছে তখনই নিজের বাচ্চার কথা মনে
হয়। কখন কোথায় কিভাবে কার মগজ ধোলাই হয়ে যাবে সেটা বলা খুব কঠিন।’
তিনি বলেন, ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেটে কী করছে, কার সাথে মিশছে এগুলোর ওপর নজর রাখা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
পিতা জানান, তাদের পরিচিত একটি পরিবারের সন্তান ইন্টারনেটে গেমস খেলছিল।
তখন সেখানে কেউ একজন তাকে জিহাদের ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করছিল।
পরে পুলিশকে জানানোর পর পুলিশ এসে কম্পিউটার ক্লিন করে ঝুঁকিপূর্ণ সবকিছু
ব্লক করে দিয়ে গেছে।
তবে বাবা বলেন, ছেলেমেয়েরা যাতে মিশ্র সংস্কৃতিতে উদার হয়ে বেড়ে উঠতে
পারে সেটা নিশ্চিত করলে এই ঝুঁকি অনেক কমে আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
ব্রিটেনে ছেলেমেয়েরা যাতে চরমপন্থার কবলে না পড়ে সেজন্যে সরকার নানা
ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। স্কুলগুলোও আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন করার চেষ্টা চলছে। বেথনাল
গ্রিনের ওই স্কুলটি থেকে একটি ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হয়েছে- এজুকেইট
এগেইন্সট হেইট ডট কম। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন মুসলিম মায়েদেরকে
ইংরেজি শিখতে বলেছেন। পুলিশও তৎপর। সিরিয়া থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী
মায়েদেরকে দিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে
যেখানে তারা সিরিয়ায় না যেতে ব্রিটিশ মায়েদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
কিন্তু এসব উদ্যোগ কতোটা কাজ করছে বলা কঠিন। সিরিয়ায় যাওয়া থেকে কাকে
আটকানো হয়েছে সেটা জানা যায় না। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে কেউ যখন
সিরিয়াতে গিয়ে পৌঁছায় তখনই সেটা খবর হয়।
তবে কুইলিয়াম ফাউন্ডেশনের গবেষক নিকিতা মালিক বলেন, ‘অল্প বয়সী
মেয়েদেরকে সিরিয়াসহ তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিয়ে যেতে ইসলামিক স্টেট
এখনও যথেষ্ট তৎপর। কারণ এই মেয়েরা তাদের স্ত্রী এবং পরবর্তী প্রজন্মের
জিহাদিদের মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। তালেবান বা আল কায়দার মতো জঙ্গি
সংগঠনগুলো এভাবে কাজ করেনি।’
বেথনাল গ্রিনের পরিবারগুলোর মতো আমরাও জানি না শামীমা, খাদিজা, আমিরা
এখন কোথায় আছে, কী করছে। তেমনি জানি না ব্রিটেনের কোনো শহরে, এখনও ওদের
মতো কোনো একজন আইএসের যাওয়ার পরিকল্পনা করছে কিনা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
