সমাজের আমূল পরিবর্তন এবং তার জন্য সংঘাত-সংঘর্ষের অবশ্যম্ভাবিতায় বিশ্বাসী অর্থে বিপ্লবী রবীন্দ্রনাথ হয়তো ছিলেন না। সেদিক থেকে ‘সংস্কারবাদী’ কথাটাই তাঁর বেলায় মনে হয় অধিকতর প্রযোজ্য। তবে তাঁর সংস্কার ধারণাটিও বিপ্লবের চেয়ে মৌলিক অর্থে ভিন্নতর বা দূরবর্তী কিছু নয়। সংস্কার বা তাঁর ভাষায় ‘সংস্করণ’ কথাটার অর্থ তিনি করেছেন ‘স্বাধীনতা-উপার্জন’ বা ‘স্বাধীনতার প্রয়াস’। আর একে তিনি জীবজগতের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করেছেন। তাঁর মতে, ‘গুটিপোকা যখন প্রজাপতি হইয়া তাহার রেশমের কারাগার ভাঙিয়া ফেলে তখন সে সংস্কার করে। মাকড়সা যখন আপনার রচিত জালে জড়াইয়া পড়িয়া মুক্ত হইবার জন্য বুঝিতে থাকে তখন সে একজন সংস্কারক।’ তবে অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতা অর্জনের ব্যাপারটি যতটা সহজ-স্বাভাবিকভাবে ঘটে মানুষের বেলায় তা হয় না।
এর কারণ, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘দুর্ভাগ্যক্রমে মনুষ্যসমাজ-সংস্কার সাপের খোলস ছাড়ার মতো একটা সহজ ব্যাপার নহে।’ এবং ‘খোলসের প্রতি এত মায়া মনুষ্যসমাজ ব্যতীত আর কাহারও নাই।’ ভারতী পত্রিকার পৌষ ১২৮৮ সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর ‘এক-চোখো সংস্কার’ প্রবন্ধে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রবন্ধটি বিশ্বভারতী-প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলীর পঞ্চদশ খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। আমাদের বর্তমান নিবন্ধে আমরা ওই প্রবন্ধের আলোকেই রবীন্দ্রনাথের সংস্কার ও/বা বিপ্লব ভাবনার একটা পরিচয় নিতে চেষ্টা করব।
শিশু অবস’ায় সন-ানকে পালন করা, তাকে শাসনে রাখার উপযোগিতা স্বীকার করেও, রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন সে- কর্তব্যবোধ যখন প্রলম্বিত হয়, এবং অভিভাবক বলপূর্বক তাঁর পালননীতি কার্যকর করতে উদ্যোগী হন, তখন প্রকৃতপক্ষে তা সন-ানের স্বাধীনতায় হস-ক্ষেপের নামান-র হয়ে দাঁড়ায়। আর তারই প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে সন-ানের তরফে অবাধ্যতা, বিদ্রোহ এবং পরিণামে উভয়পক্ষে সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘সন্তানের বর্ষে বর্ষে পরিবর্তন আছে, অথচ পিতামাতার কর্তব্যের পরিবর্তন নাই। ইহার ফল হয় এই যে, একদিন সহসা তাঁহারা দেখিলেন – সন্তান তাঁহাদের একটি আদেশ শুনিল না, মাঝে মাঝে এক-একটা বিষয়ে তাঁহাদের অবাধ্যতা করিতে লাগিল। তাঁহাদের কখনো এরূপ অভ্যাস ছিল না; বরাবর তাঁহাদের আদেশ পালিত হইয়া আসিতেছে, আজ সহসা তাহার অন্যথা দেখিয়া তাঁহাদের গায়ে সহ্য হয় না। উভয় পক্ষে একটা সংঘর্ষ বাধিয়া যায়। ইহাকেই বলে বিপ্লব। অবশেষে একে একে সে পিতামাতার একটি একটি শাসন হইতে আপনাকে মুক্ত করিতে থাকে, তাহার স্বাধীনতার সীমা পদে পদে বৃদ্ধি করিতে থাকে ও অবশেষে স্বাতন্ত্র্য লাভ করে – ইহাকেই বলে সংস্কার।’ এখানে দেখা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ ‘সংস্কার’ শব্দটিকে ‘বিপ্লবে’র চেয়ে বৃহত্তর অর্থে গ্রহণ করেছেন। প্রথমটি ঘটনা, দ্বিতীয়টি পরিণতি। প্রথমটি খণ্ড, দ্বিতীয়টি পূর্ণাঙ্গ।
তো বিপ্লব বা সংস্কার যেভাবেই দেখা হোক না কেন, এই পরিবর্তন-প্রয়াসের প্রতি রবীন্দ্রনাথের মনোভাব সব সময়ই ইতিবাচক। যেহেতু এই পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য বা স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িত। আর রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, ‘অধীনতা মাত্রই অশুভ, স্বাধীনতা মাত্রই শুভ।’ আর এই স্বাধীনতা লাভ যদি সংঘাত-সংঘর্ষের পথেও হয়, কিংবা অন্যভাবে বললে, ও ছাড়া যদি গতি না থাকে, তবে তাই সই। এ ব্যাপারে সমাজের চালু মূল্যবোধ বা শ্রেয়োনীতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে রবীন্দ্রনাথের মন-ব্য : ‘বৃদ্ধ লোকেরা আক্ষেপ করিতে থাকেন যে, সন-ানদের অবনতি হইল; স্বাধীনতাই লাভ করুক, আর আত্মনির্ভরই শিখুক, আর আলস্যই পরিহার করুক, যখন গুরুজনের অবাধ্য হইল তখন আর তাহাদের শ্রেয় কোথায়? অবাধ্য না হইলেই ভালো ছিল সন্দেহ নাই, কিন’ সংসারে যদি কোনো মঙ্গল না যুঝিয়া না পাওয়া যায়, সকলই যদি কাড়িয়া লইতে হয়, কিছুই যদি চাহিয়া না পাওয়া যায়, তাহা হইলে অবাধ্য না হইয়া আর গতি কোথায়?’
‘পৃথিবীতে কিছুই সর্বতোভাবে পাওয়া যায় না’, এবং মানুষের পক্ষে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভও ‘অসম্ভব’ বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করেন। সুতরাং স্বাধীনতা বলতে তিনি যা বুঝেছেন ও বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো ‘যথাসম্ভব স্বাধীনতা’। তাঁর মতে, মানুষের ‘প্রাণপণ চেষ্টা’ এই ‘যথাসম্ভব স্বাধীনতা’ পাওয়ার জন্য। আর এই ‘যথাসম্ভব স্বাধীন হওয়ার অভিপ্রায়ে’ মানুষকে ‘সমাজের শতসহস্র নিয়মের অধীনতা স্বীকার’ করে নিতে হয়। নিয়মের এই অধীনতা বিষয়টি যেখানে মানুষের স্বেচ্ছাকৃত কিংবা যতক্ষণ পর্যন- তা মানুষের জন্য কল্যাণপ্রদ, ততক্ষণ পর্যন- তিনি তার অনুমোদক। কিন’ অধীনতা যখন অন্ধ বা বিচারহীন পূজায় পরিণত হয়, নিয়মকে যেখানে শুধু নিয়মরক্ষার খাতিরেই মেনে চলার তাগিদ দেখা দেয়, সেখানে সে-শৃঙ্খল ছিন্ন করার প্রশ্নে তিনি নির্দ্বন্দ্ব। এ-ব্যাপারে তাঁর স্পষ্ট উক্তি : ‘যখন স্বাধীনতা রক্ষার জন্য রাজ্য-শাসনের অবশ্যক থাকিবে না বরঞ্চ বিপরীত হইবে, তখন রাজাকে দূর করো, রাজভক্তি বিসর্জন করো। যখন সমাজের কোনো নিয়ম আমাদের স্বাধীনতা-রক্ষার সাহায্য না করিবে, তখন নিয়মরক্ষার জন্য যে সে নিয়ম রক্ষা করিতে হইবে তাহা নহে। তাহা যদি করিতে হয়, তবে এক অধীনতার হস- হইতে দ্বিতীয় অধীনতার হসে- পড়িতে হয়।’ রবীন্দ্রনাথের মতে, অধীনতা যেক্ষেত্রে ‘স্বাধীনতার সোপান’ সেখানেই তার ‘যা গৌরব’ আর কেবল সেখানেই তাকে মেনে নেওয়া যেতে পারে। অন্য সময় অর্থাৎ যখন তা স্বাধীনতা অর্জনের ‘অনুপযোগী বা প্রতিরোধী’ হয়ে উঠবে ‘তখনই তাকে পদাঘাতে ভেঙে ফেলা’র কথা বলেছেন তিনি। আর এ-প্রসঙ্গে সাময়িক উপশমকে স’ায়ী আরোগ্য বলে ভুল করার কিংবা শত্রুর শত্রুকে স’ায়ী মিত্র গণ্য করার প্রবণতারও সমালোচনা করে তাঁর মন-ব্য : ‘আমাদের এমনি কপাল, যে, কণ্টক বিঁধাইয়া কণ্টককে উদ্ধার করিতে হয়, কিন’ তাই বলিয়া উদ্ধার হইয়া গেলেও যে অপর কণ্টকটিকে কৃতজ্ঞতার সহিত ক্ষতস’ানে বিঁধাইয়া রাখিতে হইবে, এমন কোনো কথা নাই।’ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে যাঁরা রক্ষণশীল, বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পরাঙ্মুখ বলেই হয়তো যাঁরা অতীত গৌরবের মধ্যে আশ্রয় খোঁজেন, তাঁদের সমালোচনায়ও রবীন্দ্রনাথ নির্দ্বন্দ্ব : ‘এক দল লোক বিলাপ করিবেই। বোধ করি এমন কাল কোনো কালে ছিল না, যখন এক দল লোক স্মৃতি-বিজড়িত কুহেলিকাময় অতীত কালের জন্য দীর্ঘনিশ্বাস না ফেলিয়াছে ও বর্তমান কালের মধ্যে সর্বনাশের, প্রলয়ের বীজ না দেখিয়াছে।’ তিনি যখন লেখেন, ‘সত্যযুগ কোনো কালে বর্তমান ছিল না, চিরকাল অতীত ছিল।’ তখন তাঁর সে-মন-ব্যের মধ্যে দিয়ে সোনালি অতীতের কল্পকাহিনির প্রতি তাঁর অনাস’াই ব্যক্ত হয় না কি?
যাঁরা সার্বিক বা আমূল পরিবর্তনে নয়, আংশিক পরিবর্তনে বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ ‘এক-চোখো’ সংস্কারক বলতে তাঁদের কথাই বুঝিয়েছেন। বলেছেন, ‘তাঁহাদের বিষয় লেখাই বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।’ আর এই ‘এক-চোখো’ সংস্কারকের উদাহরণ হিসেবে তিনি তাঁদের কথা বলেছেন যাঁরা বিধবাদের ওপর সমাজের অত্যাচার-নিগ্রহের অবসান চান, কিন’ বিধবারা সধবা হোক তা চান না। ‘অনুরাগমূলক বিবাহ’ মেনে নিতে যাঁদের আপত্তি নেই, কিন’ অসবর্ণ বিবাহের প্রশ্নে যাঁরা ‘নৈব নৈব চ’। যাঁরা পুত্রসন-ানের অধিক বয়সে বিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী; কিন’ কন্যাকে যাঁরা কম বয়সে বিয়ে দেন। স্ত্রীশিক্ষার আবশ্যকতা যাঁরা বুঝেছেন, কিন’ ‘স্ত্রী-স্বাধীনতাকে ডরান’। লোকাচারবিশেষের ওপর যাঁদের বিরাগ নেই, কিন’ তার আনুষঙ্গিক দু-একটি অনুষ্ঠানের প্রতি যাঁদের আক্রোশ। এই আংশিক পরিবর্তনকামী বা সংস্কারপ্রয়াসীদের চিন-ার ভ্রানি- বা সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে রবীন্দ্রনাথের মন-ব্য : ‘তাঁহারা বুঝেন না যে, সেই অনুষ্ঠানগুলি সেই লোকাচারের স-ম্ভ। তাঁহারা যাহা বলেন তাহার মর্ম এই – ‘সমস- বৃক্ষটির উপর আমাদের বিদ্বেষ নাই : কিন’ উহার কতকগুলা জটিল শিকড় যত অনর্থের মূল। আমরা শুদ্ধ কেবল ঐ শিকড়গুলা ছেদন করিব। আহা, গাছটি বাঁচিয়া থাক!’ এবং ‘তুমি যে মনে করিতেছ, ‘সুবিধামত আমি লোকাচারের একটিমাত্র ইঁট খসাইয়া লইব, আর অধিক নয়’, তোমার কী ভ্রম! ঐ একটি ইঁট খসিলে কতগুলি ইঁট খসিবে ও প্রাচীরে কতখানি ছিদ্র হইবে তুমি জান না।’
রবীন্দ্রনাথের মতে, আমূল পরিবর্তনকামী এবং আংশিক সংস্কারবাদী উভয় তরফই তাঁদের নিজ নিজ পথে ও পদ্ধতিতে কার্যত সামাজিক পরিবর্তনকেই এগিয়ে নেন। এর মধ্যে প্রথম দলটি ইচ্ছায় ও দ্বিতীয় দলটি ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই কাজ করেন। প্রথম দলটিকে তিনি ‘উৎপাটনশীল’ এবং দ্বিতীয় দলটিকে ‘এক-চোখো’ সংস্কারক বলে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, স্বভাবে রক্ষণশীল হয়েও ‘এক-চোখো’ সংস্কারকগণ তাদের উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে গিয়েও আসলে উৎপাটনশীলদেরই সাহায্য করেন। আর তাঁর মতে, সমাজে ‘উভয়েরই আবশ্যক’ আছে। তিনি বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন : ‘মনে করো যেখানে অবরোধপ্রথা একেবারে তুচ্ছ করিয়া পাঁচজন সংস্কারক তাঁহাদের পত্নীদিগকে গাড়ি চড়াইয়া রাস-া দিয়া লইয়া যান, সেখানে দশজন স্ত্রীলোক পাল্কী চড়িয়া যাইবার সময় দরজা খুলিয়া রাখিলেও তাঁহাদের কেহ নিন্দা করে না। কেবলমাত্র যে তাহাদের নিন্দা করে না, তাহা নহে; তাহাদের লক্ষ্য করিয়া সকলে বলাবলি করে, ‘হাঁ, এ তো বেশ! ইহাতে তো আমাদের কোনো আপত্তি নাই! কিন’ মেয়েমানুষ গাড়ি চড়িবে সে কী ভয়ানক!’ আপত্তি যে নাই, তাহার কারণ আর পাঁচজন গাড়ি চড়ে। নহিলে বিষম আপত্তি হইত।’
‘সংস্কার’, ‘পরিবর্তন’, ‘অধীনতা’, ‘মুক্তি’ – এ কথাগুলোকে কোনো অমোঘ বা স’ায়ী অর্থে রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করতে চাননি। আজ যা ‘মুক্তি’ বা ‘প্রগতিশীলতা’, হয়তো কালই তা অধীনতা ও রক্ষণশীলতায় পর্যবসিত হতে পারে। সুতরাং সংস্কার বা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সব সময়ই আছে। তা সে আংশিক বা আমূল যাই হোক। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘এক কালে যে লোকাচারের প্রাচীরটি আশ্রয়স্বরূপ ছিল, আর-এক কালে তাহাই কারাগার হইয়া দাঁড়ায়। এক দল কামান লইয়া বলে, ‘ভাঙিয়া ফেলিব।’ আরেক দল রাজমিস্ত্রির যন্ত্রাদি আনিয়া বলে, ‘না, ভাঙিয়া কাজ নাই, গোটাকতক খিড়কির দরজা তৈরি করা যাক।’ অমনি সমাজ হাঁপ ছাড়িয়া বলে, ‘হাঁ, এ বেশ কথা!’ এইরূপে আমাদের অসংখ্য লোকাচারের প্রাচীরে খিড়কির দরজা বসিয়াছে। প্রত্যহ একটি একটি করিয়া বাড়িতেছে; অবশেষে যখন দেখিবে তাহার নিয়মসমূহে এত খিড়কির দরজা হইয়াছে যে তাহার প্রাচীরত্ব আর রক্ষা হয় না, তখন সমস-টা ভাঙিয়া ফেলিতে আর আপত্তি করিবে না, এমন-কি, তখন ভাঙিয়া ফেলাও আর আবশ্যক হইবে না।’
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘এক-চোখো সংস্কার’ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন নিতান- তরুণ বয়সে, তাঁর বয়স যখন বিশ। পরবর্তীকালেও তাঁর সংস্কার বা পরিবর্তন ভাবনা মোটামুটি একই ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। নিয়ম, প্রথা বা লোকাচার যেখানে শৃঙ্খলে পরিণত হয়, সামাজিক অগ্রগমনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে সে-শেকলকে পুজো করার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ বরাবরই তাঁর মত ব্যক্ত করেছেন। যেমন মধ্যবয়সে বলাকা কাব্যগনে’র ১-সংখ্যক কবিতায় তাঁর ব্যাকুল প্রশ্ন : ‘শিকল-দেবীর ওই যে পূজাবেদী/ চিরকাল কি রইবে খাড়া?’ একই সময়ে লেখা ও একই সবুজ পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত, পরবর্তীকালে কালান-র গ্রনে’র (১৩৪৪) অন-র্ভুক্ত, ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’ প্রবন্ধেও (১৩২১) তাঁর মন-ব্য : ‘যাঁহারা বলিতেছেন যেখানে যাহা আছে সমস-ই বজায় থাক্, তাঁহারা সকলেই আমাদের প্রণম্য – কারণ, তাঁহাদের বয়স অল্পই হউক আর বেশিই হউক তাঁহারা সকলেই প্রবীণ। সংসারে তাঁহাদের প্রয়োজন আমরা অস্বীকার করি না। পৃথিবীতে এমন সমাজ নাই যেখানে তাঁহারা দণ্ড ধরিয়া বসিয়া নাই। কিন’ বিধাতার বরে যে-সমাজ বাঁচিয়া থাকিবে সে-সমাজে তাঁহাদের দণ্ডই চরম বলিয়া মান পায় না।’ তাঁর বয়স যখন ঊনসত্তর, সোভিয়েত ভ্রমণে গিয়ে সেখানে ‘গোড়া ঘেঁষে’ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা তাঁকে মুগ্ধ, বিস্মিত করেছে। যদিও পরবর্তী বাক্যেই তাঁর মন-ব্য : ‘শেষ ফলের কথা এখনো বিচার করবার সময় হয়নি।’ এমনকি সত্তরোর্ধ্ব বয়সে লেখা তাসের দেশ নাটকেও (১৩৪০) তিনি ইচ্ছার স্বাধীনতা ও ভাঙনের জয়গান গেয়েছেন। তাসের দেশের, যেখানে শিকলকে বলে অলংকার, রানীর মুখ দিয়ে বলেছেন, ‘এ ভাষা ভোলবার সময় এসেছে।’ (সংগৃহীত)
