১৫ এপ্রিল, ২০১১

যশোর রোড ও অ্যালেন গিন্সবার্গ

কোলকাতার মৌসুমী ভৌমিকের গাওয়া "যশোর রোড" গানটির সাথে অনেকেই পরিচিত। জনপ্রিয় এই গানটির সাথে একটি ঐতিহাসিক পটভূমি জড়িত রয়েছে। মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯৭১ সালে যশোর-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে বাংলাদেশের শরনার্থীদের দুঃখ দর্দশা দেখে ভরাক্রান্ত হয়ে পড়েন। পরে তিনি একটি বিখ্যাত কবিতা লিখে ফেলেন যার নাম "সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড"। পরবর্তীকালে কবিতাটি থেকে গানও করা হয়েছিল। অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিকে ভারতের কলকাতায় এসেছিলেন। কলকাতার বেশ কয়েকজন সাহিত্যিকের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল যার মধ্যে একজন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি সুনীলের বাড়িতেই উঠেছিলেন। তখন বাংলাদেশ থেকে অনেক শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী অন্যান্য শহরে আশ্রয় নিয়েছিল। ব্রিটিশ রাজের সময় পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের সংযোগকারী সড়ক হিসেবে কাজ করতো "যশোর রোড"। অনেক বৃষ্টি হওয়ায় তখন যশোর রোড পানিতে ডুবে গিয়েছিল। সড়ক পথে না পেরে গিন্সবার্গ অবশেষে নৌকায় করে বনগাঁ পেরিয়ে বাংলাদেশের যশোর সীমান্তে পৌঁছেন। তার সাথে সুনীলও ছিলেন। তারা যশোর সীমান্ত ও এর আশপাশের শিবিরগুলোতে বসবাসকারী শরণার্থীদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই গিন্সবার্গ এই কবিতাটি লিখেছিলেন। এই দীর্ঘ কবিতার সাথে সুর দিয়ে এটিকে গানে রূপ দিয়েছিলেন তিনি। আমেরিকায় ফিরে গিয়ে তার বন্ধু বব ডিলান ও অন্যান্য বিখ্যাত গায়কদের সহায়তায় এই গান গেয়ে কনসার্ট করেছিলেন। এভাবেই বাংলাদেশী শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন গিন্সবার্গ। তার গানের কয়েকটি কলি ছিল এরকম
"Millions of souls nineteen seventy one
homeless on Jessore road under grey sun
A million are dead, the million who can
Walk toward Calcutta from East Pakistan

Taxi September along Jessore Road
Oxcart skeletons drag charcoal load
past watery fields thru rain flood ruts
Dung cakes on treetrunks, plastic-roof huts

Wet processions Families walk
Stunted boys big heads don't talk
Look bony skulls & silent round eyes
Starving black angels in human disguise"


পরে একে বাংলা করে যে গানটি গাওয়া হয় তা হলো:

শত শত চোখ আকাশটা দেখে
শত শত শত মানুষের দল
যশোর রোডের দুধারে বসত
বাঁশের ছাউনি, কাদামাটি জল

কাদামাটি মাখা মানুষের দল
গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর
নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে

ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে
যুদ্ধে ছিন্ন ঘর-বাড়ি-দেশ
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান
এই কালো রাত কবে হবে শেষ

শত শত মুখ হায় একাত্তুর
যশোর রোড যে কত কথা বলে
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে
পূর্ববাংলা কোলকাতা চলে

সময় চলেছে রাজপথ ধরে
যশোর রোডেতে মানুষ মিছিল
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তুর
গরুর গাড়ি কাদা রাস্তা পিছিল

লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে
লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়
ঘরহীন ভাসে শত শত লোক
লক্ষ জননী পাগলের প্রায়

রিফুইজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু
পেট গুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে
এইটুকু শিশু এতবড় চোখ
দিশেহারা মা কার কাছে ছোটে

সেপ্টেম্বর হায় একাত্তুর
এত এত শুধু মানুষের মুখ
যুদ্ধ মৃত্যু তবুও সপ্ন
ফসলের মাঠে ফেলে আসা সুখ

কার কাছে বলি ভাত রুটি কথা
কাকে বলি কর কর কর ত্রান
কাকে বলি ওগো মৃত্যু থামাও
মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রান

কাঁদ কাঁদ তুমি মানুষের দল
তোমার শরীর ক্ষত দিয়ে ঢাকা
জননীর কোলে আধপেটা শিশু
এ কেমন বাঁচা? বেঁচে মরে থাকা

ছোট ছোট তুমি মানুষের দল
তোমার ঘরেও মৃত্যুর ছায়া
গুলিতে ছিন্ন দেহ-মন-মাটি
ঘর ছেড়েছ তো মাটি মিছে মায়া

সেপ্টেম্বর হায় একাত্তুর
ঘর ভেঙে গেছে যুদ্ধের ঝড়ে
যশোর রোডের দু'ধারে মানুষ
এত এত লোক শুধু কেন মরে

শত শত চোখ আকাশটা দেখে
শত শত শত শিশু মরে গেল
যশোর রোডের যুদ্ধ ক্ষেত্রে
ছেঁড়া সংসার সব এলোমেলো

কাদামাটি মাখা মানুষের দল
গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে
আকাশে বসত মরা ইশ্বর
নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে

শত শত মুখ হায় একাত্তুর
যশোর রোড যে কত কথা বলে
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে
পূর্ববাংলা কোলকাতা চলে

গিন্সবার্গের কবিতায় সে সময়কার যুদ্ধে বিধ্বস্ত বাংলাদেশের চিত্রটিই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাংলাদেশের পরম বন্ধু গিন্সবার্গ ৫ই এপ্রিল, ১৯৯৭ সালে নিউইয়র্কে পরলোক গমন করেন।