সমবেগে
গতিশীল বস্তুর গতির বিবরণের মধ্য দিয়ে আপেক্ষিক তত্ত্বের সূচনা হয় ঊনবিংশ
শতকের প্রথম দিকে। হারমান লরেঞ্জ, হেনরি পয়েনকেরে ও আলবার্ট আইনস্টাইনের
কাজের মধ্য দিয়ে তত্ত্বটি পরিচিতি লাভ করে আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব (১৯০৫)
নামে। পরের ১০ বছরে আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব (১৯১৬) নির্মাণ
করেন। এটি মূলত মহাকর্ষের তত্ত্ব। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর্থার
স্ট্যানলি এডিংটন ১৯১৯ সালে বুধ গ্রহ সম্পর্কিত আপেক্ষিকতার সাধারণ
তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণ করেন। এর পর থেকে আজ পর্যন্ত (নিউট্রিনোর
ঘটনা ছাড়া) সব পরীক্ষায় তত্ত্বটি সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ করার
মতো ব্যাপার এই যে আইনস্টাইনের তত্ত্ব নিউটনের তত্ত্বকে পুরোপরি বাতিল করে
দেয়নি, বরং দেখিয়েছে যে নিউটনের তত্ত্ব কেবল আলোর চেয়ে অনেক কম গতিশীল
বস্তুর জন্য প্রযোজ্য। অনুরূপ কথা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম স্থপতি
ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ও এরউইন শ্রোয়েডিংগারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যাঁরা
১৯২৬ সালে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কথা ভেবেছিলেন। ২২ সেপ্টেম্বর সার্নের
(CERN : Central European Organi“ation for Nuclear Research) বিজ্ঞানীরা
নিউট্রিনো সাব-পার্টিকলটি আলোর চেয়ে বেশি গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনার কথা
প্রকাশ করলে 'আইস্টাইন কি মিথ্যা হয়ে গেলেন?' ধরনের প্রশ্ন উঠতে থাকে। প্রশ্নের সঠিকতা, প্রশ্নের দর্শন আসলে
প্রশ্নগুলোর মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। খবরটি পাওয়ার পর সাংবাদিকরা
ছুটে গেছেন স্টিফেন হকিংয়ের কাছে। তিনি বলেছেন, 'বিষয়টা এখনো মন্তব্য করার
স্তরে ওঠেনি। আরো পরীক্ষণ দরকার এবং পরিষ্কারভাবে বিষয়টা প্রকাশিত হওয়া
দরকার।' তার পরও পত্রিকাগুলো লিখল, আইনস্টাইন প্রশ্নের মুখোমুখি! এ
পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বিজ্ঞানের কাজ তত্ত্বের সাধারণীকরণ তাত্তি্বক
পদার্থবিজ্ঞানসহ মৌলিক বিজ্ঞানের সব শাখাই প্রথমে কোনো বিষয়কে স্বীকার্য
হিসেবে ধরে নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এই স্বীকার্য বা সূত্রগুলো বিজ্ঞানীরা
তাঁদের পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থেকে দাঁড় করান। সব সময় সূত্রগুলো পরীক্ষার
উপায়ও থাকে না প্রযুক্তির অভাবে। তখন ওই তত্ত্ব বা স্বীকার্যটি ধরে নিয়ে
কাজ এগোতে থাকে। একসময় পরীক্ষার ফলাফল যদি মিলে যায়, তাহলে ধরে নেওয়া হয়,
তত্ত্বটি ঠিক। আবার ভুল হলে, হয় শুধরে নেওয়া হয় প্রয়োজনীয় অংশ অথবা পুরোটাই
বাদ দিয়ে নতুন তত্ত্বের খোঁজ করা হয়। যে তত্ত্ব খারিজ হয়ে যায়, সেটাই
কিন্তু নতুন তত্ত্বের ভ্রুণ হিসেবে কাজ করে। সেই তত্ত্বও কিছুদিন পথ দেখিয়ে
আরো নিখুঁত ফললাভে প্রত্যাশী হয়। যে তত্ত্ব যত বেশি আধুনিক, সেটি তত বেশি
জিনিসের ব্যাখ্যা দিতে পারে। একে আমরা বলি সাধারণীকরণ। যেমন_একসময় ভাবা
হতো, পৃথিবীর ঘূর্ণনের নিয়ম এক আর বাকি গ্রহ-নক্ষত্রের চলাফেরা দেবতাদের
ইচ্ছা মোতাবেক। ফলে তাঁদের জন্য নিয়ম আলাদা। নিউটন এসে বললেন, আমাদের জন্য
পদার্থবিদ্যার যা নিয়ম, নক্ষত্রের জন্যও তা-ই। এটা ছিল
এঙ্ট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল (পৃথিবীর বাইরের) ও টেরেস্ট্রিয়াল(পৃথিবীর)
পদার্থবিদ্যার সাধারণীকরণ। আইনস্টাইন দেখালেন, এমন নিয়ম আছে, যা শুধু
বস্তুর চরিত্র নয়, শক্তি ও বস্তুকে একই সঙ্গে ব্যাখ্যা করতে পারে। অথচ ভাবা
হতো, বস্তু আর শক্তি দুটি ভিন্ন জিনিস। এটা আরো বড় পরিসরে সাধারণীকরণ।
আইনস্টাইনের তত্ত্ব নিউটনের তত্ত্বের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ
হিসেবে প্রকাশিত হয়। সুতরাং নতুন তত্ত্ব আগের সময়ে ভাবা তত্ত্বকে উচ্ছেদ
করে না বা মুছে ফেলে না; বরং আগের তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা পূরণ করে আরো সঠিকতর
রূপে প্রকাশিত হয়। চিরকালই এই ভাঙাগড়া চলছে। ফলে নিউট্রিনোর চরিত্র
ব্যাখ্যা করতে আইনস্টাইনের তত্ত্ব অসমর্থ হলে নতুন তত্ত্ব এসে তাকে পুনরায়
ব্যাখ্যা করবে। এখানে সত্য-মিথ্যার প্রসঙ্গটি অবৈজ্ঞানিক।
সার্ন যা প্রকাশ করেছে:সার্ন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তাদের নিউট্রিনো উৎপাদক যন্ত্র দিয়ে ১৫ হাজার নিউট্রিনো সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিল। ছুড়ে দেওয়া নিউট্রিনো ৭৩০ কিলোমিটার পার হয়ে আসার পর ইতালির সান গ্রোসোতে অবস্থিত নিউট্রিনো সংবেদনশীল ডিটেক্টর যন্ত্র অপেরায় (অসিলেশন প্রজেক্ট উইথ ইমালশন-ট্র্যাকিং অ্যাপারেটাস) এসে অস্তিত্বের জানান দেয়। পেঁৗছাতে যে সময় লেগেছে, তা আলোর গতির তুলনায় ৬০ ন্যানোসেকেন্ড কম। অর্থাৎ আলোর আগেই চলে আসে নিউট্রিনো। এই ফলাফলে অবাক বিজ্ঞানীরা ছয় মাস ধরে বারবার ভুল বের করার চেষ্টা করেছেন। কোনো ভুল না পেয়ে অবশেষে তাঁরা এই ফলাফল প্রকাশ করেন। যদিও একজন জার্মান বিজ্ঞানী ক্যারেন হ্যাগনার এই ফলাফল কেন আরো পরীক্ষা করে প্রকাশ করা হলো না, বক্তব্য দিয়ে পদত্যাগ করেছেন প্রকল্প থেকে। আর সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখেই সার্ন তাদের এই গবেষণার ফলাফল আবার পরীক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
ভবিষ্যৎ তত্ত্ব নির্মাণের পথ
প্রথমেই বলা দরকার, সার্নের গবেষণাগারে যে ফল আমরা পেয়েছি, তা ধরে কোনোভাবেই কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। আইনস্টাইনের তত্ত্ব এখন পর্যন্ত এই ঘটনা ছাড়া পৃথিবীর বাকি সব ঘটনার নিখুঁত ব্যাখ্যা দিয়ে আসছে। ফলে পৃথিবীর অন্য একাধিক গবেষণাগারে সার্নের অনুরূপ আয়োজন ও পরীক্ষায় একই রকম ফলাফল এলে তবেই কাজ শুরু করা যাবে। তারপর এমন তত্ত্ব নির্মাণ করতে হবে, যা নতুন ফলাফলসহ এর আগের পদার্থবিদ্যার সব ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। তখনই বলা যাবে, আইনস্টাইনের তত্ত্বের উত্তরণ ঘটেছে।
যদি এই ফলাফল ঠিক হয়?
নিউট্রিনোর ধর্ম এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। এই কণা সূর্য থেকে এসে আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে চলে যায় প্রতিনিয়তই। এর ধর্ম আবিষ্কার পদার্থবিদ্যায় যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়ে দিলেও সম্ভবত সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন কোনো ছাপ ফেলতে পারবে না অদূর-ভবিষ্যতে।
পরের ধাপের প্রতীক্ষায় বিজ্ঞানীরা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে নিউট্রিনোর ওপর গবেষণা চালানো হবে শিগগিরই। ফার্মিল্যাবে উৎপাদিত নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা হয় এখানে। অন্যদিকে জাপানের টি২কে ল্যাবেও চালানো হবে একই পরীক্ষা। এদের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে পরের ধাপে এটি কোন দিকে মোড় নেবে। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত যে বিজ্ঞানের কোনো তত্ত্বই অনন্তকাল টিকে থাকে না। মানুষের প্রকৃতি জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকে বিজ্ঞানের সূত্রাবলি প্রায়ই বদলে যায়। (সূত্র: কালের কন্ঠ)
